লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে ইঞ্জিন বিকল হয়ে টানা নয় দিন ভেসে থাকা একটি নৌকার ৪২ অভিবাসনপ্রত্যাশীর মধ্যে সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার চার যুবকসহ সাতজন নিখোঁজ রয়েছেন। উদ্ধার হওয়া যাত্রীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভয়াবহ খাদ্য ও পানির সংকটে নৌকায় থাকা অন্তত ১১ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে। দীর্ঘ সময় সাগরে ভেসে থাকার পর মরদেহগুলোতে পচন ধরলে সেগুলো সাগরে ফেলে দিতে বাধ্য হন জীবিতরা।
নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন শান্তিগঞ্জ উপজেলার পূর্ব পাগলা ইউনিয়নের চিকারকান্দি গ্রামের কৃষক রাজ মিয়ার ছেলে রিপন মিয়া (১৯), হযরত খানের ছেলে মামুন খান (২১), ইকরাম উদ্দিনের ছেলে এনামুল হক খান (১৮) এবং রনসী গ্রামের একলাছ উদ্দিনের ছেলে তালহা আহমদ (২৪)। এ ছাড়া পাথারিয়া গ্রামের আব্দুল হেকিমের ছেলে আব্দুল করিমসহ আরও কয়েকজনের বিষয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তবে আব্দুল করিম জীবিত উদ্ধার হয়ে মিশরের মারসা মাতরুহ জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। নিখোঁজ অন্যদের পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
জানা গেছে, গত ৩ আগস্ট রাতে ৪২ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে নিয়ে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা লিবিয়ার তাবারুক উপকূল থেকে গ্রিসের উদ্দেশে রওনা হয়। নৌকাটিতে থাকা ৪২ জনের মধ্যে ৩৮ জনই ছিলেন বাংলাদেশি। যাত্রাপথে নৌকাটি ঝড়ের কবলে পড়লে নৌকায় থাকা খাবার ও পানির মজুত সাগরে ভেসে যায়।
এরপরও গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা অব্যাহত রাখেন অভিবাসনপ্রত্যাশীরা। একপর্যায়ে গ্রিসের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর হঠাৎ নৌকার ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। ফলে বিশাল ভূমধ্যসাগরের মধ্যে নৌকাটি নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ভাসতে থাকে।
টানা নয় দিন সাগরে ভেসে থাকার পর বাতাস ও সাগরের স্রোতে নৌকাটি মিশরের মারসা মাতরুহ উপকূলের কাছাকাছি পৌঁছায়। পরে মিশরের নিরাপত্তা বাহিনী নৌকায় থাকা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের উদ্ধার করে। উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিদের মধ্যে ১৮ জনকে মারসা মাতরুহ জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আব্দুল করিম ঘটনার ভয়াবহ বর্ণনা দিয়েছেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, **‘আমরা ৪২ জন গ্রিসের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলাম। গ্রিসের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর আমাদের নৌকার ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে যায়। ফলে আর সামনে এগোতে পারিনি।’**
তিনি বলেন, **‘আমাদের কাছে খাবার বা পানি কিছুই ছিল না। চোখের সামনে নয়জন বাংলাদেশি মারা গেছেন। তাদের মরদেহ সাগরে ফেলে দিতে হয়েছে। পরে আরও দুজন মারা যান। দীর্ঘ সময় লবণাক্ত পানিতে থাকার কারণে আমাদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে পচন ধরে দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করে।’**
জীবিত উদ্ধার হওয়া আব্দুল করিম এখন দেশে ফেরার আকুতি জানিয়ে বলেন, **‘আমরা এখন মারসা মাতরুহ হাসপাতালে ভর্তি। আমাদের বাঁচান। আমরা দেশে ফিরে যেতে চাই।’**
এ ঘটনায় সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জের চার যুবকের পরিবারের মধ্যে নেমে এসেছে গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা। প্রিয়জনদের কোনো সন্ধান না পাওয়ায় স্বজনরা অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। নিখোঁজ যুবকদের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তারা জীবিত আছেন কি না—এ নিয়ে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে চরম উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উন্নত জীবনের আশায় দালালের মাধ্যমে বিপজ্জনক সমুদ্রপথে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন এসব তরুণ। কিন্তু সেই স্বপ্নের যাত্রাই এখন পরিণত হয়েছে ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে। ভূমধ্যসাগরের উত্তাল জলরাশিতে একদিকে খাবার ও পানির সংকট, অন্যদিকে ইঞ্জিন বিকল হয়ে যাওয়ায় অসহায় অবস্থায় পড়েন তারা।
এ ঘটনায় নিখোঁজদের পরিবারের সদস্যরা সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মাধ্যমে দ্রুত তাদের স্বজনদের অবস্থান শনাক্ত এবং জীবিতদের দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে মানবপাচারকারী ও অবৈধভাবে অভিবাসন করানোর সঙ্গে জড়িত চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি উঠেছে।
দ.ক/সিলেট