পাহাড়ের ঢালে আঁধার নামলেই শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী কিংবা নালীতাবাড়ীর সীমান্তজুড়ে জেগে ওঠে এক চিরচেনা আতঙ্ক। চারদিকের হইচই, মশাল জ্বালানো আর টিনের থালা বাজানোর বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে শেরপুরের সীমান্ত। লোকালয়ে ঢুকে পড়া বুনো হাতির দল ধানখেত পিষে ফেলছে—সংবাদপত্রের পাতায় বা বিশ্ব হাতি দিবসের সেমিনারে এটাই সাধারণ খবর। কিন্তু এই গতানুগতিক কভারেজের আড়ালে ঢাকা পড়ে থাকে এমন এক নির্মম সত্য, যা বলতে নীতি নির্ধারক থেকে শুরু করে স্থানীয় প্রভাবশালী—সব পক্ষই নীরব।
সত্যিটা হলো, সরকারি খাতায় বা আন্তর্জাতিক নকশায় হাতির যে ‘বিচরণপথ’ বা ‘করিডোর’ আঁকা আছে, বাস্তবে তার একটি ইঞ্চি পথও আজ আর ফাঁকা নেই—সব ক’টি করিডোরই একশত ভাগ বেদখল।
কাগজে ‘সংবেদনশীল পথ’, মাটিতে ইট-পাথরের দেয়াল
বন বিভাগ আর পরিবেশবিদরা বছরের পর বছর ধরে বলে আসছেন, “হাতি পথ হারিয়ে লোকালয়ে ঢুকছে।” অথচ এটি পথের ভুল নয়, পথের ধ্বংস। যে নিখুঁত প্রাকৃতিক ফানেল দিয়ে মেঘালয়ের বনাঞ্চল থেকে গজরাজেরা যুগে যুগে শেরপুরের সমতলে নেমে আসত, সেটির প্রতিটি প্রবেশমুখে আজ দাঁড়িয়ে আছে মানুষের স্থায়ী অবকাঠামো—পাকা ঘরবাড়ি, ইটভাটা, অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলনের আড়ত, মুরগির খামার, কিংবা বাণিজ্যিক রিসোর্ট।
বিজ্ঞান যাকে হাতির *Generational Memory* বা বংশগত স্মৃতির মানচিত্র বলে, সেই শতবছরের মানচিত্রের ওপর মানুষ আজ তুলে দিয়েছে ইট-পাথরের দেয়াল। একটি হাতি যখন তার পূর্বপুরুষদের রক্তের স্মৃতির ওপর ভর করে পাহাড়ি পথ দিয়ে নিচে নামে, সে কোনো ফাঁকা প্রান্তর পায় না; হঠাৎ মুখোমুখি হয় বহুতল ভবনের শক্ত দেয়াল আর অবৈধ উচ্চভোল্টেজের বিদ্যুতায়িত ফাঁদের। হাতি লোকালয়ে ‘আক্রমণ’ করতে আসছে না—একটি প্রজাতিকে চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলে তাদের শেষ বেরোনোর পথটাও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
হাতি খেদা’ থেকে আধুনিক দখলদারিত্ব: কেবল রূপ বদলেছে শোষণের
আজকের হাতি-মানুষের লড়াই কিন্তু হঠাৎ গজিয়ে ওঠেনি। মধ্যযুগীয় শেরপুরে জমিদারদের বিনোদন আর রাজস্ব আদায়ের জন্য পরিচালিত হতো নিষ্ঠুর ‘হাতি খেদা’। সুসং ও শেরপুরের পরগনায় হাতি ধরার জন্য স্থানীয় আদিবাসী ও সাধারণ কৃষকদের বাধ্য করা হতো গভীর পাহাড়ে রক্তক্ষয়ী শ্রম দিতে।
সেদিন ক্ষমতার দম্ভে হাতিকে বন্দি করা হতো শিকলে, আর আজ ক্ষমতার দম্ভে তাদের তাড়িয়ে মারা হচ্ছে নিজস্ব ভূমি থেকে। নামকাওয়াস্তে সামাজিক বনায়নের নামে শাল-গজারি বনের প্রাকৃতিক ইকোসিস্টেম ধ্বংস করে রোপণ করা হয়েছে ইউক্যালিপটাসের মতো মেহগনি ও কাঠজাতীয় গাছের একপ্রজাতির বাগান (Monoculture)। একদিকে খাদ্যশৃঙ্খল ধ্বংস, অন্যদিকে করিডোর দখল—দুটি মিলে হাতিকে পরিণত করা হয়েছে সীমান্তের কাঁটাতারে আটকে থাকা এক অঘোষিত ‘শরণার্থী’তে। ভারতে তাড়া খেলে বিএসএফের তাড়া, আর বাংলাদেশে ঢুকলে বিদ্যুৎ ও আগুনের ফাঁদ।
করিডোর পুনরুদ্ধারের নামে প্রশাসনিক ভণ্ডামি
হাতি দিবসে যখন ‘করিডোর সুরক্ষার’ বুলি আওড়ানো হয়, তখন মাঠের বাস্তবতা থাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। সম্পূর্ণ বেদখল হয়ে যাওয়া করিডোর মুক্ত করার কোনো রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক সদিচ্ছা দৃশ্যমান নয়। কারণ, এই দখলের পেছনে জড়িয়ে আছে রাজনৈতিক প্রশ্রয়, বনভূমির অবৈধ কেনাবেচা এবং একশ্রেণীর স্থানীয় প্রভাবশালীদের স্বার্থ।
ফলাফল? লোকদেখানো কিছু সাময়িক ব্যবস্থা—সায়রেন বাজানো, সোলার ফেন্সিং কিংবা হাতি তাড়ানোর মহড়া। সোলার ফেন্সিং যে স্থায়ী সমাধান নয়, তা হাতি তার প্রখর বুদ্ধিমত্তা দিয়েই প্রমাণ করেছে; তারা শুকনো কাঠের ডাল ফেলে তারের বিদ্যুৎ পরীক্ষা করতে শেখে। কিন্তু যা তারা বুঝতে পারে না তা হলো—কখন কীভাবে তাদের পিতৃপুরুষের হেঁটে যাওয়া শতবছরের পুরো পথটাই মানুষের লোভে একশত ভাগ নিখোঁজ হয়ে গেল।
বিশ্ব হাতি দিবসে এবার আর কোনো মিষ্টি কথার আবরণে সত্য ঢাকলে চলবে না। আসল সত্য হলো, শেরপুর সীমান্তে আমরা হাতির সাথে কোনো দ্বন্দ্বে নেই; আমরা একটি বিপন্ন প্রজাতির সমস্ত পথ রুদ্ধ করে তাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছি। যতক্ষণ না বেদখল হয়ে যাওয়া এই করিডোরগুলো রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে উদ্ধার করা হচ্ছে, ততক্ষণ হাতি তাড়ানোর যেকোনো আয়োজন কেবলই এক নির্মম প্রহসন। প্রকৃতি তার পথ চেনে; আমরা যদি জোর করে সেই পথ রুদ্ধ করি, তবে তার মাশুল মানবজাতিকেই গুণতে হবে—আজ কিংবা কাল।
লেখক: সাংবাদিক
দ.ক.২৬