প্রতিদিন অল্প কিছু সময় হলেও শিশুর সঙ্গে বই পড়তে হবে। কেবল বই পড়ে শোনালেই হবে না, গল্পটি নিয়ে শিশুর সঙ্গে কথাও বলতে হবে।
শিশুর হাতে বই তুলে দেওয়া সহজ কিন্তু তাকে বইয়ের প্রতি আগ্রহী করে তোলা একটু কঠিন। এছাড়া আজকের ব্যস্ত জীবনে কাজ, পড়ালেখা, সংসারের নানা দায়িত্বের ভিড়ে সন্তানের সঙ্গে বসে বই পড়ার সময় বের করাও অনেক বাবা-মায়ের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে। অথচ আনন্দের সঙ্গে বই পড়ার অভ্যাস শিশুর কল্পনাশক্তি, ভাষা ও চিন্তাশক্তি বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শিশুকে কীভাবে বইয়ের জগতে আগ্রহী করে তোলা যায়, সে বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন চাইল্ড কেয়ার, ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এডুকেশন কনসালটেন্ট দীপু মাহমুদ এবং শিশুশিখন প্রতিষ্ঠান ছায়াতরুর তাহাজ্জুল ইসলাম ফয়সাল। তাদের পরামর্শে শিশুর বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার কয়েকটি সহজ উপায় নিচে দেয়া হলো-
শিশুর সঙ্গে বই পড়ার জন্য প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং অল্প সময় নিয়মিত বই পড়াটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
দীপু মাহমুদ বলেন, ঘুমানোর আগে বই পড়ার সময়টি বেশ ভালো হতে পারে। তবে শিশু ছোট হলে সকালে নাশতার সময়ও তার সঙ্গে বই পড়া যায়। কারণ দিনের শেষে শিশুরা অনেক সময় ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
তাহাজ্জুল ইসলাম ফয়সালও প্রতিদিন অল্প সময় শিশুর সঙ্গে বই পড়ার পরামর্শ দেন। তবে শুধু বই পড়ে শোনালেই হবে না, গল্পটি নিয়ে শিশুর সঙ্গে কথাও বলতে হবে। গল্পের চরিত্র, ঘটনা কিংবা তার নিজের পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে কথা বলা যেতে পারে।
বাবা-মাকেই হতে হবে উদাহরণ
শিশু যা দেখে, তা থেকেই অনেক কিছু শেখে। তাই বাবা-মা নিয়মিত বই পড়লে শিশুর মধ্যেও বই পড়ার আগ্রহ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
তাহাজ্জুল ইসলাম ফয়সালের পরামর্শ, ‘সব সময় বই পড়ুন।’ যাতায়াতের সময়, ঘুমানোর আগে কিংবা অবসর পেলেই বই হাতে তুলে নিতে পারেন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বুকট্রাস্টের একটি গবেষণা বলছে, বাবা-মা বা অভিভাবক বই পড়তে ভালোবাসলে শিশুরও বই পড়া উপভোগ করার সম্ভাবনা ৪০ শতাংশ বেশি। তাই শিশুকে শুধু ‘বই পড়ো’ বললেই হবে না। নিজের আচরণ দিয়েও তাকে বই পড়ার আনন্দ বুঝিয়ে দিতে হবে।
সব শিশু একইভাবে বই পড়তে শেখে না। কারও পড়তে একটু বেশি সময় লাগে, কেউ আবার বই পড়ার চেয়ে গল্প শুনতেই বেশি পছন্দ করে। এ ক্ষেত্রে অডিওবুক হতে পারে দারুণ একটি মাধ্যম।
দীপু মাহমুদ অডিওবুককে বই পড়তে সমস্যায় থাকা শিশুদের জন্য ‘দারুণ একটি পথ’ হিসেবে দেখেন। দীর্ঘ গাড়িযাত্রার সময় শিশুকে অডিওবুক শোনানোর পরামর্শ দেন তিনি।
অডিওবুকের আরেকটি সুবিধা হলো, গল্পের সঙ্গে শিশুর আবেগের একটি সম্পর্ক তৈরি হয়। কেউ যখন আনন্দ নিয়ে গল্প শোনেন, হাসেন বা গল্পের কোনো ঘটনায় আবেগ প্রকাশ করেন, তখন শিশুও বুঝতে পারে—বই আসলে আনন্দের একটি জগৎ।
বই পড়ার সময় ফোন দূরে রাখুন:
শিশু যখন আপনাকে বই পড়ে শোনাচ্ছে, তখন আপনার মনোযোগ যেন অন্য কোথাও না থাকে। বিশেষ করে হাতে ফোন নিয়ে বসে থাকলে শিশুর মনে হতে পারে, তার চেয়ে ফোনই আপনার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তাহাজ্জুল ইসলাম ফয়সালের পরামর্শ, বই পড়ার সময় ফোনটা দূরে রাখুন এবং শিশুকে পুরো মনোযোগ দিন।
বই পড়ার এই সময়টুকু শুধু পড়ার সময় নয়; এটি বাবা-মা ও সন্তানের সম্পর্ক আরও গভীর করারও একটি সুযোগ। শিশুর পাশে বসে তার কথা শোনা, প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কিংবা গল্প নিয়ে একসঙ্গে হাসাহাসি করলে সে আনন্দ পায়। এতে সম্পর্কেও বাড়ে আন্তরিকতা।
লাইব্রেরি হতে পারে শিশুর প্রিয় ঠিকানা
শিশুর বইয়ের প্রতি আগ্রহ বাড়াতে লাইব্রেরির চেয়ে ভালো জায়গা আর কী হতে পারে!
দীপু মাহমুদের মতে, শিশুর জন্য লাইব্রেরি হতে পারে দারুণ একটি জায়গা। শিশুকে নিয়ে স্থানীয় লাইব্রেরিতে যাওয়ার অভ্যাস করতে পারেন। সেখানে সে নিজের পছন্দের বই বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবে।
বই বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রেও শিশুকে খুব বেশি নিয়ন্ত্রণ করার দরকার নেই। সে যদি কমিকস পছন্দ করে, কমিকস পড়ুক। ছবি পছন্দ করলে ছবির বই পড়ুক। মজার গল্প, রহস্য, রূপকথা কিংবা প্রাণীর গল্প—যে বই তাকে আনন্দ দেয়, সেখান থেকেই শুরু হোক বইয়ের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব। কারণ, শিশুর যে বই পড়ে আনন্দ পায়, সেটিই তার জন্য ভালো বই।
আনন্দের সঙ্গে বই পড়ার অভ্যাস শিশুর কল্পনাশক্তি, ভাষা ও চিন্তাশক্তি বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বই পড়া মানে কেবল পড়া নয়
একটি ভালো বই শিশুকে নতুন অনেক জগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। সে গল্পের চরিত্রের সঙ্গে পরিচিত হয়, নতুন শব্দ শেখে, নতুন জায়গা সম্পর্কে জানতে পারে এবং নিজের মতো করে একটি কল্পনার জগৎ তৈরি করে।
তাহাজ্জুল ইসলাম ফয়সালের মতে, শিশুকে বই পড়ানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বই পড়াকে যেন কখনো শাস্তি বা বাধ্যবাধকতা মনে না হয়। বরং বইকে আনন্দের অংশ করে তুলতে হবে।
প্রতিদিন কয়েক মিনিটের একটি গল্প, ঘুমানোর আগে প্রিয় বইয়ের কয়েকটি পাতা, গাড়িতে বসে অডিওবুক শোনা কিংবা সপ্তাহে এক দিন লাইব্রেরিতে যাওয়া, এমন ছোট ছোট অভ্যাসই একসময় শিশুর জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
শিশুর বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার সবচেয়ে ভালো উপায় বইকে তার জীবনের আনন্দের একটি অংশ করে তোলা।
দ.ক.সিআর.২৬