হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলায় ‘ফ্যামিলি কার্ড শুমারি-২০২৬’-এর তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার পদের ফলাফল প্রকাশের পর নিয়োগ প্রক্রিয়া ও মনোনীতদের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে তীব্র বিতর্ক ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। প্রকাশিত তালিকায় বিগত সরকারের আমলে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকা আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের একাধিক নেতাকর্মী এবং স্থানীয় বিএনপি-যুবদল নেতাদের স্বজনদের নাম উঠে আসায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে।
প্রকাশিত ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, লাখাই ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি মতিউর রহমানের ছেলে তারেক মিয়া সুপারভাইজার হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। এছাড়া ৪ নম্বর বামৈ ইউনিয়নের তালিকায় সুপারভাইজার পদে স্থান পেয়েছেন ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি বদরুল আলম। বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করে ওই কমিটির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম জানান, বদরুল আলম ৪ নম্বর বামৈ ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
এছাড়া মুড়িয়াউক ইউনিয়নে ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি তথ্য সংগ্রহকারী হিসেবে স্থান পেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বুল্লা, করাব ও মুড়িয়াউক ইউনিয়নে স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের স্ত্রী ও মেয়েরা স্থান পেলেও, বঞ্চিত করা হয়েছে আন্দোলন-সংগ্রামের ত্যাগী কর্মীদের।
নিয়োগের ফলাফল প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই ফেসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতারা:ফেসবুকে আলী আহমদ নামে একজন ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখেন, মুড়িয়াউক পশ্চিমপাড়ের একটি নির্দিষ্ট এলাকা থেকে ৫ জনকে সুযোগ দেওয়া হলেও সুনেশ্বর ও তেঘরিয়ার নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এমনকি জুলাই আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী ও বিএনপি পরিবারের সদস্যদের রিজার্ভ তালিকায় রাখা হয়েছে।
উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আসাফুজ্জামান চৌধুরী রাজন ফেসবুকে লেখেন,নির্বাচনের সময় আমরা ভোটের জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে ফ্যামিলি কার্ডের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। আর এখন তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার পদে ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি কীভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হন? লাখাইয়ে কি এখনো ফ্যাসিবাদের দোসররা সক্রিয়?
যুবদল নেতা এস কে আরিফ প্রশ্ন তুলে লেখেন,যে মেধার জন্য ছাত্র-জনতা আন্দোলন করেছিল, আজ সেই মেধাকে প্রাধান্য না দিয়ে আওয়ামী লীগ ক্যাটাগরিতে কোটা পদ্ধতিতে স্বজনদের স্থান দেওয়া হয়েছে। স্বজনপ্রীতি করবেন তো পরীক্ষা ও হয়রানির নাটক করার কী দরকার ছিল?আব্দুর রহিম নামে স্থানীয় এক ব্যক্তি ভিডিও বার্তার মাধ্যমে দাবি করেন, নিয়োগের ফলাফল সঠিক হয়নি এবং বুল্লা ইউনিয়নের এক ব্যক্তি পরীক্ষা না দিয়েও চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পেয়েছেন।
নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে মারাত্মক প্রশ্ন তুলেছেন এমডি কিবরিয়া আহমেদ নামে এক চাকরিপ্রার্থী। তিনি জানান, উপজেলা সমাজসেবা অফিসে ভাইভা দিতে গিয়ে তিনি জানতে পারেন ৫৪ জন নিয়োগের বিপরীতে আগেই ৫৫ জন নির্বাচন করা হয়ে গেছে। তিনি বলেন, উপর মহলের খেলায় মেধার কোনো স্থান হয়নি। সাধারণ মানুষকে অযথা ডেকে এনে হয়রানি করার কোনো মানে হয় না।তিনি তার বক্তব্যের সত্যতার জন্য হেল্যাল আরফিন শুভ নামে আরেক প্রত্যক্ষদর্শীর কথা উল্লেখ করেন, যিনি এই বৈষম্যের প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।
রাজনৈতিক নেতাদের সুপারিশে নিয়োগের বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সৈয়দ মুরাদ ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, দলীয় নেতারা যাদের নাম দিয়েছেন, তারা সে অনুযায়ী তালিকা করতে বাধ্য হয়েছেন।
স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ প্রক্রিয়ায় নিয়োগ না দিয়ে স্বজনপ্রীতি ও বিতর্কিত ব্যক্তিদের সুযোগ দেওয়ায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে স্থানীয় জনগণ। তারা অনতিবিলম্বে এই বিতর্কিত তালিকা বাতিল করে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে নতুন তালিকা প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন।
দ.ক.সিআর