খ ম জায়েদ হোসেন, নাসিরনগর: নাসিরনগর সরকারি ডিগ্রি মহাবিদ্যালয়ে দুটি বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) বা অনার্স কোর্স পাঠদানের অনুমোদন দিয়েছে সরকার।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সরকারি কলেজ–৪ শাখার এক আদেশে এই অনুমোদন দেওয়া হয়। গত ২১ জুলাই জারিকৃত আদেশে বিষয় দুটিতে অনার্স কোর্স চালুর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া বিষয় দুটি হলো– ইংরেজি এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি)।
স্থানীয় সংসদ সদস্য এম এ হান্নানের আধা-সরকারি পত্রের (ডিও লেটার) প্রেক্ষিতে এই অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে আদেশে উল্লেখ রয়েছে।
নাসিরনগর সরকারি ডিগ্রি মহাবিদ্যালয়ে অনার্স কোর্স অনুমোদনের খবরে পুরো উপজেলাসহ পার্শ্ববর্তী হাওর এলাকা হবিগঞ্জের লাখাই, কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল এবং মাধবপুরের (হবিগঞ্জ) শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নিজ উপজেলায় অনার্স চালু হলে শিক্ষার্থীরা কম খরচে ও কম ভোগান্তিতে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাবে। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য এটি দারুণ সুযোগ সৃষ্টি করবে। আর্থিক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে যেসব পরিবার মেয়েদের দূরের কলেজে পাঠাতে চায় না, তাদের উচ্চশিক্ষার পথ উন্মুক্ত হবে। আইসিটির মতো যুগপোযোগি বিষয়ে অনার্স পড়ার সুযোগ শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার গঠনেও সহায়ক হবে।
ঢাকাস্থ নাসিরনগর ছাত্রকল্যাণ সমিতির সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. মুক্তার হোসেন প্রতিবেদককে বলেন, নাসিরনগর সরকারি কলেজে অনার্স চালুর সিদ্ধান্তটি প্রশংসনীয়। তবে দূরদূরান্তের শিক্ষার্থীদের শতভাগ সুবিধা নিশ্চিত করতে হাওর অধ্যুষিত ভাটি এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি। বিশেষ করে নাসিরনগর–ভলাকুট–চাতলপাড়–অরুয়াইল সড়কের 'নাইন ব্রিজ' প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। তা না হলে এ উদ্যোগের সুফল সবাই পাবে না।
উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কে এম বশির উদ্দিন তুহিন বলেন, অনার্স কোর্স চালুর এই খবর নিঃসন্দেহে আনন্দের। আমি বর্তমান এমপি মহোদয়ের এই উদ্যোগ প্রশসংসার দাবিদার। এতদিন এই এলাকার শিক্ষার্থীরা অনার্স করতে হলে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেটসহ ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও হবিগঞ্জ সদরের কলেজগুলোতে যেতে হতো। নাসিরনগর কলেজে অনার্স চালু হলে তারা কম খরচে এলাকায় থেকে পড়াশোনা করতে পারবে।
নাসিরনগর আশুতোষ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও উপজেলা বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি মো. আব্দুর রহিম বলেন, এটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। নাসিরনগর সরকারি কলেজে অনার্স চালু হলে পুরো উপজেলার শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবে। পার্শ্ববর্তী হাওরবেষ্টিত উপজেলাগুলোর শিক্ষার্থীরাও এখান থেকে কম খরচে অনার্স করতে পারবে। ইংরেজি ও আইসিটির মতো ভালো বিষয়ে অনার্স করার সুযোগ তাদের জন্য বড় পাওয়া।
অনার্স কোর্স চালুর অনুমোদনকে স্বাগত জানিয়ে নাসিরনগর সরকারি কলেজের সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও বাচিক শিল্পী জামিল ফোরকান জানান, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অন্য কোনো কলেজে এখন পর্যন্ত আইসিটি বিষয়ে সম্মান কোর্স নেই। সে হিসেবে নাসিরনগর কলেজে এটি চালু হওয়া একটি ঐতিহাসিক ও যুগোপযোগী ঘটনা। তবে দুটি বিষয়েই পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় কার্যক্রম শুরু করতে কিছুটা সময় লাগতে পারে।
একই শঙ্কার কথা জানান চাতলপাড় ডিগ্রি কলেজের ব্যবস্থাপনা কমিটির সাবেক সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মো. আব্দুল বাছির। তিনি বলেন, পর্যাপ্ত শিক্ষকের অভাব দূর করতে স্থানীয় এমপি মহোদয় শিক্ষামন্ত্রীর মাধ্যমে অন্যান্য সরকারি কলেজ থেকে শিক্ষক বদলির উদ্যোগ নিতে পারেন।
ভাটি এলাকার হাওরবেষ্টিত কলেজটির ব্যবস্থাপনা কমিটির সাবেক সভাপতি আরও বলেন, নাসিরনগর সরকারি কলেজে অনার্স চালু প্রশংসনীয় উদ্যোগ। দুটি বিষয়ে অনার্সের অনুমোদন পেলেও তা চালু হতে হয়তো সময় লাগবে। যখনই চালু হোক হাওর এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য এটা আর্শীবাদ হিসেবে দেখব। বিশেষ করে মেয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উচ্চশিক্ষা নেওয়ার প্রবণতা বাড়বে। কারণ, আর্থিক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে ভাটি এলাকার অনেক পরিবার দূরবর্তী স্থানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মেয়েদের পাঠাতে চায় না।
১৯৮৭ সালে স্থাপিত নাসিরনগর সরকারি ডিগ্রি কলেজটি ২০১৮ সালে সরকারিকরণ করা হয়। ৩২ একর বিস্তৃত এই ক্যাম্পাসে বর্তমানে ১ হাজার ১৪৫ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে মানবিক, বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষার পাশাপাশি বিএ, বিএসএস, বিএসসি ও বিবিএস ডিগ্রি (পাস) কোর্স চালু রয়েছে। রয়েছে স্নাতকোত্তর কোর্সও।
কলেজটির প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী এ কে এম আমিনুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অনার্স চালুর চেষ্টা হলেও এখন তা আলোর মুখ দেখছে। আমি অনার্স কোর্স চালুর এ উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। বর্তমান সংসদ সদস্যের এ উদ্যোগ প্রশংসনীয়।
এ কে এম আমিনুল ইসলাম আরও বলেন, নাসিরনগর কলেজ ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও পুরোদমে কার্যক্রম চালু হয় ১৯৯০ সালে। ১৯৯৩ সালে এমপিওভুক্ত হয়। তখন হাওর অধ্যুষিত পার্শ্ববর্তী দুই উপজেলা অষ্টগ্রাম ও লাখাইয়ে কোনো কলেজ ছিল না। নাসিরনগরের ভাটি অঞ্চল বলে পরিচিত চাতলপাড়েও কোনো কলেজ ছিল না। ফলে নাসিরনগর কলেজই ছিল এই এলাকার অধিকাংশ শিক্ষার্থীর ভরসা। এখন অনার্স কোর্স চালু এই সুবিধা পাবে তারা। কারণ উল্লিখিত কলেজগুলোতে এখনও অনার্স চালু হয়নি। তবে ইংরেজি ও আইসিটির পাশাপাশি রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান বা অর্থনীতির মতো বিষয়গুলো যুক্ত করা গেলে হাওরাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা আরও বেশি উপকৃত হতো।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নাসিরনগর সরকারি ডিগ্রি মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ মো. রমজান আলী বলেন, আমরা বেশ কয়েকটি বিষয়ে অনার্স চালুর আবেদন করে আসছি, কিন্তু সফল হচ্ছিলাম না। বর্তমান এমপি মহোদয়ের (এম এ হান্নান) চেষ্টায় আমার কলেজে দুটি বিষয়ে অনার্স কোর্স চালুর অনুমোদন পাওয়া গেছে। আমরা এখন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করব।
শিক্ষক সংকট নিয়ে অধ্যক্ষ মো. রমজান আলী বলেন, আমরা ইতোমধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষক চেয়ে আবেদন করেছি। আশা করি এমপি মহোদয়ের সহযোগিতায় দ্রুতই পর্যাপ্ত শিক্ষক পদায়ন করা হবে। এসব বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া–১ (নাসিরনগর) আসনের সংসদ সদস্য এম এ হান্নান বলেন, নাসিরনগর সরকারি কলেজে অনার্স কোর্স চালুর খবরে উপজেলাবাসী আনন্দিত। আমার ডিও লেটার ও অনুরোধের প্রেক্ষিতে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী ইংরেজি ও আইসিটি বিষয়ে ব্যবস্থা নিয়েছেন।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে আইসিটি বিষয়ে অনার্স না থাকলেও বিশেষ বিবেচনায় নাসিরনগরে এটি অনুমোদিত হয়েছে, যা আমাদের জন্য গর্বের। এখন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে। এটা বাস্তবায়ন হলে আমার উপজেলার শিক্ষার্থীরা ছাড়াও হাওরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের উপকার হবে। ভবিষ্যতে আরও বেশ কয়েকটি বিষয়ে অনার্স চালুর চেষ্টা করব।
দ.ক/জিএইচ