মীর ফয়সল আহমেদ: একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রযুক্তি। এই যুগে বিশ্বের মানুষ বই পড়ে, এই কথাটি বঙ্গদেশে তাচ্ছিল্যের সাথে বলা হয়। কিন্তু আমরা বহির্বিশ্বে নজর দিলেই দেখতে পাই, উন্নত বিশ্বের দেশগুলো যেমন; প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও বৈশ্বিক নাগরিক হিসেবে কাজ করছে। সেখানে আমরা প্রযুক্তির অপব্যবহার করে বেড়াচ্ছি।
এখানে বই পড়াটা অনেকটা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ বই পড়া থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। এর কারণ হিসেবে আমরা এককভাবে ব্যক্তি কে দোষারোপ করছি না। এখানে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা জরুরি। আঠারো শতক ছিলো সাহিত্যের যুগ। বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতি হাজার বছরের পুরোনো। বাংলা ভাষা আদি ইন্দো-ইয়োরোপীয় হওয়ায় এখানে ভাষায় এবং সংস্কৃতি মিশ্র।
আমরা বই পড়ুয়া জাতি হিসেবে সমীক্ষায় অনেক পিছিয়ে আছি। অথচ বাংলা সাহিত্য ভান্ডার খুবই সমৃদ্ধ। বাংলা সাহিত্য রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, মাইকেল মধুসূদন দত্ত প্রমুখ। আমাদের সাহিত্যের অঙ্গনে তাঁদের পদচারণা অম্লান। সিইও ওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিনের ২০২৫ সমীক্ষা অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি বই পড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গড়ে ১৭ বই পড়ে। তারপর যাদের অবস্থান আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত, যারা গড়ে ১৬ টা বই পড়ে। আমাদের বাংলাদেশেরও অবস্থান রয়েছে, তবে সেটা ৯৭ তম দেশ হিসেবে। বাংলাদেশের মানুষ গড়ে ২.৫ টি বই পড়ে। বছরে প্রায় ৬২ ঘন্টা। সিইও ম্যগাজিনের সমীক্ষা অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি বই পড়ুয়া দেশের তালিকা: ১. যুক্তরাষ্ট্র ২. ভারত ৩. যুক্তরাজ্য ৪. ফ্রান্স এবং ৫. ইতালি। এই দেশগুলোর জনগণ মাসে কমপক্ষে ১ টা বই হলেও পড়া হয় ৷ ই-বুক এবং অডিও বুকের সময়েও, তারা এখন কাগজে ছাপা বই পড়ে পছন্দ করেন।
বাংলাদেশের মানুষ বই পড়া বিষয়ে পিছিয়ে পড়ার কয়েকটি কারণ আছে; বই পড়া অভ্যাসে পরিণত না হওয়া, হাতের নাগালে বই না পাওয়া, বই পড়ার মধ্যে অনীহা, একাডেমিক পড়াশোনা ছাড়া অন্যান্য বই পড়া অগুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা, বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ায় আসক্ত হওয়া ইত্যাদি। বর্তমানে বই পড়ার আগ্রহ আরো বেশি কমে যাচ্ছে। মানুষ ইলেকট্রনিকস ডিভাইসের প্রতি আসক্ত হচ্ছে। আমি মনে করে করি, বই না পড়া মানে নিজের মধ্যে অজ্ঞতার ক্যান্সার লালন করা৷
একজন সুকুমার চিত্তের মানুষের কাছে বই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়৷ একজন বিখ্যাত ব্যক্তি বলেছেন, '' ঘরের সবচেয়ে সুন্দর আসবাপত্রের বই বই সবচেয়ে সুন্দর ''। বাংলা সাহিত্যের রম্যলেখক সৈয়দ মুজতবা আলী বলেছেন, '' বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয়না''। অথচ বাংলাদেশের মানুষ সবচেয়ে কৃপণতা করে বই কিনতে গেলে। বই মানেই তাদের কাছে মনে হয় ফ্রী বস্তু। আমার ব্যক্তিগত মতামত হলো, সরকারের উচিত প্রতিটি গ্রামে একটি করে লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করা জরুরি ।
কুসংস্কার, প্রথা, অজ্ঞতা, শঠতা দূরীকরণের জন্য বইয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। মাধ্যমিক স্কল গুলোতে সমীক্ষা চালালে দেখবেন, নামেমাত্র স্কুল লাইব্রেরি আছে। থাকলেও সেখানে বই পড়ুয়া কম৷ এক্ষেত্রে স্কল কর্তৃপক্ষের উচিত বই পড়া নিয়ে সেমিনার, নাটক, বিতর্ক এবং বই পর্যালোচনার আয়োজন করা৷ যারা বই নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে, তাদের সহায়তা নেওয়া। তাহলেই বই পড়া এবং সুকুমার মানুষ তৈরি করা সম্ভব।
রাতারাতি বই পড়ার অভ্যাস করা সম্ভব নয়৷ তবে বাংলাদেশের বিশাল একটা পাঠক শ্রেণী আছে। যাদের সাথে সমম্বয় করে নতুন নতুন ধারণা নিয়ে বই নিয়ে কাজ করা যাবে৷ বাংলাদেশের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো যদি তাদের সাথে এক হয়ে কাজ করে, তাহলে আরো যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব । পাঠকের চাহিদা এবং বই হাতে পাওয়ার সহজ লভ্যতা একটা সময় দেশের মানুষ বই পড়ুয়া জাতি হিসেবে আমরাও একদিন বিশ্বের প্রথম শ্রেণির বই পড়ুয়া জাতি হিসেবে গড়ে তুলা সম্ভব।
লেখক: কথাসাহিত্যিক, কলামিস্ট ও সোশ্যাল এক্টিভিস্ট
দ.ক/এমএফ