সাজিদুর রহমান: স্মরনাতীতকালের ইতিহাস মতে হবিগঞ্জের বাহুবলে সাংবাদিকতা আশির দশক থেকে শুরু। যাদের হাত ধরে মহান পেশার অভিযাত্রা বাহুবলে তাদের সবাই ছিলেন শিক্ষিত, ভদ্র- মার্জিত ও সমাজের গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব। তারা নিঃস্বার্থভাবে স্থানীয়, আঞ্চলিক ও জাতীয় মিডিয়ায় পর্যায়ক্রমে তুলে ধরেছেন বাহুবলের ইতিহাস-ঐতিয্য, কৃষ্টি-কালচার ও সমস্যা-সম্ভাবনার চিত্র। তখন আমার আপন বড় ভাই সহ সীমিত সংখ্যক কলম সৈনিক পেশাদারিত্বের সাথে বাহুবলবাসীর স্বার্থকে ধারণ করে লেখনি জগতে সুনাম বয়ে আনেন।
ঐক্যবদ্ধ অভিযাত্রাঃ সিলেটের প্রাচীনতম পত্রিকা সাপ্তাহিক যুগভেরীর প্রতিনিধি এ. কে. এম.আব্দুল মুসাব্বির চৌধুরীর নেতৃত্বে প্রেসক্লাব গঠনের মাধ্যমে ১৯৮৫ সন থেকে বাহুবলে সাংবাদিকদের একটি প্লাটফর্ম গড়ে উঠে। এর সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন, মাস্টার আব্দুল জব্বার (হবিগঞ্জ প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও তৎকালীন পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকার হবিগঞ্জ মহকুমা প্রতিনিধি), মাওলানা নুরুল আমিন (বাহুবল মডেল প্রেসক্লাবের সিনিয়র সহ-সভাপতি), মাওলানা আবু তয়্যিব মোঃ নজীব, মাওলানা গোলাম মওলা নেজামী, মাওলানা মখলিছুর রহমান, ডাক্তার আব্দুল ওয়াদুদ। আশির দশকের শেষলগ্নে এ পেশায় যুক্ত হন মাওলানা আব্দুল গফুর আল হাবিব, কবি আব্দুল হান্নান রেনু, সৈয়দ আব্দুল মান্নান । উল্লেখিতদের অনেকেই ছিলেন সাহিত্য অঙ্গনের আলোকিত মুখ।
নবীনদের আগমনঃ নব্বই দশকের শুরুতে প্রবীণদের সংস্পর্শ লাভ করেন নবীন কয়েক সংবাদ কর্মী। আমি অধমও এসময় প্রেসক্লাবের সদস্য পদ লাভ করি। সমসাময়িক আমার সিনিয়র সদস্য ছিলেন, আব্দুল আউয়াল তহবিদার সবুজ, মোশাহেদ উদ্দিন চৌধুরী, তড়িৎ মোহন ধর, শেখ লুৎফুর রহমান, সাঈদ আহমদ, মোস্তফা কামাল, পরে নুরুল ইসলাম মনি, ফরিদ আল মামুন। মূলত তখন থেকেই বাহুবলে সাংবাদিকতা জনসমক্ষে প্রস্ফুটিত হয়। তখনই একদিন সাহিত্যিক সৈয়দ আব্দুল্লাহ ক্লাবের অন্তর্ভুক্ত হন। একান্নভাবে সবাই স্ব স্ব অবস্থান থেকে নিরবিচ্ছিন্নভাবে পেশাদারিত্ব চালিয়ে যেতে থাকেন। পেশাগত দায়িত্ব পালনে একে অপরের প্রতি ছিলাম পরিপূরক শক্তি। ছিলনা কোন প্রতিহিংসা বা অসহিষ্ণু মনোভাব।
যখন যেভাবে বিতর্ক সৃষ্টি :
২০০০ সালের দিকে কতিপয় সদস্য ক্লাবের অন্তর্ভুক্ত হন। এর কিছু দিন যেতে না যেতেই ২০০৩ সালের মাঝা-মাঝিতে বিতর্কিত পন্থায় জনৈক ব্যক্তিকে আজীবন সদস্য পদ প্রদানের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাংবাদিকদের মধ্যে বিভক্তি দেখা দেয়। অধিকাংশ সাংবাদিকদের বর্জনের মুখে আমন্ত্রিত অতিথি সংসদ সদস্যগনের অনুপস্থিতিতে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের থানা সভাপতি জনাব আকাদ্দছ মিয়া বাবুলকে প্রধান অতিথি করে ইউএনও'র সভাপতিত্বে আজীবন সদস্য পদ প্রদানের অনুষ্ঠান দায়সারা গোছে অনুষ্ঠিত হয়।
তখন থেকে শুরু চারটি ক্লাবের :
বৃহৎ একটি অংশ আব্দুল আউয়াল তহবিলদার সবুজকে সভাপতি ও নুরুল ইসলাম মনিকে সাধারণ সম্পাদক করে ১৭ সদস্য বিশিষ্ট বাহুবল উপজেলা প্রেসক্লাব গঠন করেন। আমি অধমও ছিলাম এ ক্লাবের অন্তর্ভুক্ত। সাঈদ আহমেদ ও এফ আর হারিছ গঠন করেন উপজেলা প্রেসক্লাব। সৈয়দ আব্দুল মান্নানের নেতৃত্বে গঠিত হয় সাংবাদিক সমিতি ও সোহেল আহমেদ কুটি, জাবেদ আলী, নুরুল ইসলাম নুর ও এম শামছুদ্দিন বাহুবল প্রেসক্লাবেই থেকে যান।
যেভাবে গঠিত হয় বাহুবল মডেল প্রেসক্লাবঃ বিছিন্নভাবে বাহুবলের সাংবাদিকতার কার্যক্রম চলমানকালে ওয়ান-এলিভেনের সময় সবকটি ক্লাবকে একত্রিকরনের তাগিদ দেন হবিগঞ্জের সেনা কর্মকর্তা লেঃ কর্নেল মনিরুল ইসলাম আকন্দ। বিষয়টি আমাকে অবগত করেন আমার অতি প্রিয়জন বাহুবলের পরিছন্ন সাংবাদিক মোঃ নুরুল ইসলাম মনি। তখন আমি দৈনিক হবিগঞ্জ সমাচার পত্রিকায় বার্তা সম্পাদক হিসেবে কর্মরত।
একত্রিকরণের প্রক্রিয়া বা বিশদ ঘটনা অবহিত না থাকায় এতে আমি সায় দেইনি। এভাবে চলে আরও কয়েক বছর। ২০১১ সালে তৎকালীন ইউএনও জনাব আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী নতুন করে উদ্যোগ নেন। ইএনও মহোদয়ের মধ্যস্থতায় বিবদমান গ্রুপের মধ্যে কয়েক দফা আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এক পর্যায়ে সকলের সর্বসম্মতিক্রমে সকল ক্লাব বিলুপ্তি ঘোষণা করে ১১-১১-১১ তে গঠিত হয় বাহুবল মডেল প্রেসক্লাব।
বাহুবল মডেল প্রেসক্লাবের কমিটি :
২০১১ সালের ১১ নভেম্বর বাহুবল মডেল প্রেসক্লাবের সভাপতি নিযুক্ত হন বিলুপ্ত বাহুবল উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি আব্দুল আউয়াল তহবিলদার সবুজ ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নিযুক্ত হন বিলুপ্ত বাহুবল প্রেসক্লাবের সভাপতি সোহেল আহমেদ কুটি। তারা এক বছর মেয়াদি কমিটির দায়িত্ব পালন করেন। পরে আনুষ্ঠানিক নির্বাচনের মাধ্যমে দ্বি-বার্ষিক কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তারই আলোকে জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয় বাহুবল মডেল প্রেসক্লাবের নির্বাচন। এ নির্বাচনে নিরঙ্কুশভাবে সভাপতি নির্বাচিত হন নুরুল ইসলাম নুর ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন এম শামছুদ্দিন। এরপর থেকে মডেল প্রেসক্লাব আইন শৃ্ঙ্খলা কমিটির সদস্য সহ উপজেলার প্রতিটি মিটিংয়ে অংশ গ্রহণ ছিল। বর্তমানে আইন শৃ্ঙ্খলা কমিটি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে রহস্যজনক কারণে।
আবারও ফিরে বিভাজন :
সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠনের পরে পরাজিত সভাপতি প্রার্থী আব্দুল আউয়াল তহবিলদার সবুজ ও সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী (উপজেলা আওয়ামীগের যুগ্ম সম্পাদক) সোহেল আহমেদ কুটি এক ধরনের নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। ক্লাবের মাসিক বা সাধারণ সভায় অনুপস্থিত থাকেন। বছর কয়েক পর নিষ্ক্রিয় কয়েকজনের মাধ্যমে বিলুপ্ত বাহুবল প্রেসক্লাবের কার্যক্রম শুরুর চেষ্টা করা হয়। এ প্রেক্ষিতে বাহুবল প্রেসক্লাবের কার্যক্রম চ্যালেঞ্জ করে হবিগঞ্জ আদালতে স্বত্ব মামলা দায়ের করেন বাহুবল মডেল প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি নুরুল ইসলাম নুর। এ মামলাটি চলমান রয়েছে।
বাহুবলের সাংবাদিকতায় কলঙ্কের তিলকঃ বাহুবলের সংবাদপত্র বা সাংবাদিকতার গৌরবোজ্জল ইতিহাসের ধারাবাহিকতা থাকলেও হাল-জামানায় হুমকির মুখে। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতার সুবাদে প্রিন্ট- ইলেকট্রনিক ও অনলাইন মিডিয়াকে পাশ কাটিয়ে ফেসবুক ও টিকটকাররা এ পেশাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। বিশেষ করে জাতীয় টিভির লগু সম্বলিত বোমের আদলে বাজার থেকে বোম কিনে টিকটিক ও ফেসবুকাররা যত্রতত্র চষে বেড়াচ্ছেন। কোথাও কোথাও তারা নিজেদেরকে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করছেন। এ ধরনের নকল সাংবাদিকদের ভিড়ে পেশাদার সাংবাদিকরা হারিয়ে যাচ্ছেন। বাহুবলে বর্তমানে এসব সাংবাদিকদের তৎপরতা অতিমাত্রায় পৌঁছে গেছে। মানুষ বলাবলি করছেন আসলে এরা কারা? এদের কারণে বাহুবলের সাংবাদিকতার পেশা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। ক্রমশ তারা নানান বিতর্কীত কর্মকাণ্ডের জন্ম দিচ্ছেন। কোন কোন সরকারি কর্মকর্তা ভুঁইফোঁড় এসব সাংবাদিকদের দুধ কলা দিয়ে পোষছেন। এতে রহস্য আরও ঘনিভুত হচ্ছে।
প্রকৃত সাংবাদিকদের অভিমতঃ
টিকটক ও ফেসবুকারদের কবল থেকে মহান পেশাকে রক্ষা করতে সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরী। এদের পৃষ্ঠপোষক দূর্নীতিবাজ আমলা ও সুবিধাবাদী রাজনৈতিকদের চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা। পেশায় আগত নবীনদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ব্যতিত প্রকাশ্যে সাংবাদিক পরিচয় থেকে বিরত রাখা এবং ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়গুলো এড়িয়ে চলতে পরামর্শ দেওয়া।
লেখক: সাধারণ সম্পাদক
বাহুবল মডেল প্রেসক্লাব।
প্রতিনিধি দৈনিক আমার দেশ
দ.ক.সিআর.২৬