জিয়াউর রহমান সাজন: হবিগঞ্জের লস্করপুর ও শায়েস্তাগঞ্জ ফরেস্ট চেকপোস্টে বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছত্রছায়ায় বহিরাগতদের দিয়ে রাতভর বেপরোয়া চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। কাঠ ও বাঁশ বোঝাই বিভিন্ন যানবাহন আটকে নিয়মবহির্ভূতভাবে এই অর্থ আদায় করা হচ্ছে। চাঁদার একটি অংশ বহিরাগতরা রেখে বাকি বড় অংশ ফরেস্ট অফিসারদের পকেটে যায় বলে জানা গেছে। গত ১ জুলাই (বুধবার) রাত ৮টার দিকে লস্করপুর ফরেস্ট চেকপোস্টে এমনই এক চাঁদাবাজির ঘটনা হাতেনাতে ক্যামেরাবন্দী হয়েছে।
সরেজমিনে জানা যায়, গত বুধবার রাতে লস্করপুর চেকপোস্টে একটি বাঁশ বোঝাই গাড়ি আটকে ফরেস্টের লোক পরিচয়ে চাঁদা তুলতে যান আশরাফ আলী নামের এক বহিরাগত। এ সময় স্থানীয় সাংবাদিকরা চাঁদাবাজির দৃশ্য ভিডিও করতে গেলে আশরাফ আলী প্রথমে নিজেকে ফরেস্টের লোক বলে দাবি করেন। পরে কিসের টাকা নিচ্ছিলেন জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, পাওনা টাকা ফেরত নিচ্ছেন। তবে সাংবাদিকদের কাছে চাঁদাবাজির অকাট্য ভিডিও প্রমাণ থাকার কথা জানালে একপর্যায়ে তিনি স্বীকার করেন, গাড়ি চালক তাকে ‘চা খাওয়ার টাকা’ দিয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই চক্রের সাথে স্থানীয় প্রভাবশালী মোহাম্মদ ওয়াদুদ মিয়া ও রুবেল মিয়া নামের আরও দুই ব্যক্তি জড়িত রয়েছেন। রুবেল ও ওয়াদুদ মিয়া বন বিভাগের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী না হলেও তারা বন বিভাগের পোশাক পরে চেকপোস্টে নিজেদের বন কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে অবাধে চাঁদাবাজি করে বেড়াচ্ছেন। ভিডিও ধারণের সময় ওয়াদুদ মিয়া সাংবাদিকদের কাজে বাধা প্রদান করেন। নিজের পরিচয় জানতে চাইলে ওয়াদুদ মিয়া দাবি করেন, তিনি দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরিতে ফরেস্টে ডিউটি করেন।
অভিযোগ রয়েছে, অভিযুক্ত ওয়াদুদ ও রুবেল সহ ৩ জন রেঞ্জ কর্মকর্তা তোফায়েল আহমেদ চৌধুরীর মৌখিক নির্দেশে দৈনন্দিন কাজে নিযুক্ত রয়েছেন। তবে সরকারি কোনো নিয়োগপত্র ছাড়াই তারা কীভাবে বন বিভাগের পোশাক পরে দায়িত্ব পালন করছেন, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ভুক্তভোগী একাধিক চালক অভিযোগ করে বলেন, ওয়াদুদ মিয়ার বাড়ি লস্করপুর চেকপোস্টের কাছেই। তিনি রাতে গাড়ি আটকে নানা অজুহাতে অবৈধ গাছ বা বাঁশের গাড়ি বলে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ফরেস্টের আসিফ ফকিরসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এসে গাড়ি আটকে বড় অঙ্কের টাকা দাবি করেন এবং হয়রানি শুরু করেন। চালকদের দাবি, শায়েস্তাগঞ্জ ও লস্করপুর চেকপোস্টে সঠিক ও বৈধ কাগজপত্র থাকার পরেও কাঠ ও বাঁশবাহী লরি বা ট্রাক থেকে নিয়মিত নিয়মবহির্ভূত অর্থ আদায় করা হচ্ছে। বিশেষ করে বনজ কাঠ বোঝাই ট্রাক এবং ছোট যানবাহনে কাঠ পরিবহন করা হলে সেগুলোকে টার্গেট করে বেশি হয়রানি করা হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বন বিভাগের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সরাসরি নির্দেশেই এই বহিরাগতরা রাতে লাঠি ও টর্চলাইট হাতে রাস্তায় নামে। সারারাত গাড়ি আটকে যে টাকা তোলা হয়, তা পরবর্তীতে ফরেস্টের লোকজন এবং বহিরাগতদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা হয়। সাংবাদিকদের ক্যামেরায় এই পুরো চাঁদাবাজির দৃশ্য ও অপরাধীদের স্বীকারোক্তি বন্দি হলেও এখনো প্রশাসনের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এবিষয়ে হবিগঞ্জ সহকারী বন সংরক্ষ জয়নাল আবেদীনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে ওই বিষয়ে অবগত নন বলে জানান এবং রেঞ্জ কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করতে বলেন।
এই চাঁদাবাজি সিন্ডিকেটের হাত থেকে মুক্তি পেতে এবং জড়িত ফরেস্ট কর্মকর্তা ও বহিরাগতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী চালক ও স্থানীয় সচেতন মহল।
এ বিষয়ে শায়েস্তাগঞ্জ রেঞ্জ কর্মকর্তা তোফায়েল আহমেদ চৌধুরীর সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে। তাকে পাওয়া যায়নি।
দ.ক/জি.এইচ.এস