কালনেত্র ডেস্ক: দেশের সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও নতুন ভবন নির্মাণ দৃশ্যমান হলেও প্রকট আকার ধারণ করেছে শিক্ষক সংকট। অনুমোদিত পদের একটি বড় অংশ শূন্য থাকায় এবং সময়মতো পদোন্নতি না হওয়ায় স্থবিরতা নেমে এসেছে শিক্ষা প্রশাসনে। ফলে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক পাঠদান এবং মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষার গুণগত মান।
শিক্ষা খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও শিক্ষকদের মতে, বিগত দেড় দশকে তিন শতাধিক বিদ্যালয় সরকারি করা হয়েছে । এ ছাড়া বেশির ভাগ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নতুন ভবন হয়েছে। অবকাঠামো উন্নয়নে যতটা জোর দেওয়া হয়েছে, শিক্ষকসংকট দূর করা, প্রধান শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষার মানোন্নয়ন কার্যক্রমে জোর কম দেওয়া হয়েছে। অবকাঠামো উন্নয়নে কেনাকাটা ও দরপত্রে কমিশন–বাণিজ্যের সুযোগ থাকে।
বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ৭০২টি। এসব বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পদ ১৫ হাজার ২৯৩টি। এর মধ্যে ২ হাজার ৮৪২টি পদ শূন্য, অর্থাৎ ১৮ শতাংশের বেশি পদে শিক্ষক নেই।
বর্তমান জনবলকাঠামো পর্যাপ্ত কি না, সেই প্রশ্নও রয়েছে। তার ওপর দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক পদ শূন্য। সম্প্রতি সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে ৭২৮ জন সহকারী শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। তবে এই নিয়োগ সম্পন্ন হলেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পদ শূন্যই থেকে যাবে।
জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক অধ্যাপক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ বলেন, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকসংকট কমাতে সরকার কাজ করছে। এ বিষয়ে সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী, সচিবসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আলোচনা করছেন, যাতে দ্রুত শূন্য পদে নিয়োগ দেওয়া যায়। পাশাপাশি শূন্য প্রশাসনিক পদ পূরণ এবং পদোন্নতি-সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনেও কাজ চলছে।
২০১০ খ্রিষ্টাব্দের শিক্ষানীতি অনুযায়ী, ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে দেশের বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ১:৩০-এ নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা ছিল। তবে বাস্তবতা হলো, সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে এখনো গড়ে প্রতি ৩৭ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে মাত্র ১ জন শিক্ষক রয়েছেন; কোনো কোনো বিদ্যালয়ে এই সংকট আরও তীব্র।
শিক্ষকসংকটের পাশাপাশি মাধ্যমিক শিক্ষা প্রশাসনেও বড় ধরনের নেতৃত্বের সংকট দেখা দিয়েছে। দেশের ৭০২টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৮৩টি প্রধান শিক্ষকের পদই শূন্য। এর পাশাপাশি সহকারী প্রধান শিক্ষকের ২৪৯টি পদও খালি পড়ে আছে।
শুধু বিদ্যালয় পর্যায়েই নয়, মাধ্যমিক শিক্ষার সামগ্রিক প্রশাসনিক কাঠামোতেই দীর্ঘদিন ধরে স্থবিরতা বিরাজ করছে। মাউশির ৯টি আঞ্চলিক কার্যালয় ও প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালকের ১০টি পদই বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। এ ছাড়া ৬৪টি জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পদের মধ্যে ২৩টি শূন্য। বিদ্যালয় পরিদর্শকের ১৬টি পদের সব কটিই খালি। পদোন্নতি দীর্ঘদিন আটকে থাকায় প্রশাসনিক কাঠামোয় একধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শুরুর পদটি হলো সহকারী শিক্ষক। পূর্বে এই পদের শিক্ষকদের সিংহভাগই কোনো পদোন্নতি ছাড়া, প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ বছর একই পদে চাকরি করে অবসরে যেতেন। তবে ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দে ‘সিনিয়র শিক্ষক’ নামে নবম গ্রেডের পদ সৃষ্টি করা হয়। এই পদে ২০২১ খ্রিষ্টাব্দের জুনে পদোন্নতি দেওয়া হয়। কিন্তু নানা জটিলতায় এই পদে পদোন্নতিও এখন আটকে আছে। সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদগুলোতেও মূলত চলতি দায়িত্ব পালন করছেন শিক্ষকেরা। নিয়োগবিধি–সংক্রান্ত জটিলতায় উপপরিচালকের পদেও নিয়মিত কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া যাচ্ছে না।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শিক্ষকদের অভিযোগ, এমনিতেই তাদের বেতন-ভাতা কম। তার মধ্যে ঠিক সময়ে পদোন্নতি দেওয়া হয় না। শিক্ষকদের এভাবে হতাশার মধ্যে রেখে তাদের কাছ থেকে ভালো মানের শিক্ষাও আশা করা কঠিন।
নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষা খাতকে বিশেষভাবে প্রাধান্য দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিএনপি সরকার। ইশতেহারে বলা হয়েছে, দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক, কর্মমুখী, উৎপাদনমুখী এবং সময়োপযোগী করে গড়ে তোলা হবে। শিক্ষার সব স্তরে জোর দেওয়া হবে। তবে প্রাথমিক শিক্ষা বেশি জোর পাবে। শিক্ষা খাতের বাজেট বরাদ্দ ধাপে ধাপে জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) ৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে।
এদিকে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ২ শতাংশে উন্নীত করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। মোট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা। বরাদ্দ আগের বছরের চেয়ে বেড়েছে ৪৯ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।
শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শিক্ষা খাতে অবকাঠামো উন্নয়ন অনেক হয়েছে। এখন দরকার গুণমান বৃদ্ধিতে নজর দেওয়া। সে জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত ভালো শিক্ষক।
দেশের শিক্ষা খাতে বিগত বছরগুলোতে দৃশ্যমান অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রচুর হলেও, শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে বলে মনে করছেন শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাদের মতে, ইটের ওপর ইট গেঁথে ভবন নির্মাণ বা ভৌত অবকাঠামো বাড়ালেই শিক্ষার মান বাড়ে না; বরং শিক্ষার আসল মান বাড়াতে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পর্যাপ্ত সংখ্যক যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ।
দ.ক/সিআর