অজয় বিশ্বাস: সমাজবিজ্ঞানী এবং বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনকে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান ‘মানসিক ও কৌশলগত ভিত্তি’অথবা প্রেরণা হিসেবে বিবেচনা করা যায়। এর পেছনে বেশ কিছু জোরালো কারণ রয়েছে:
ক. কিশোর বিদ্রোহ ও রাষ্ট্রমেরামতের চেতনা: ২০১৮ সালে স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা ‘রাষ্ট্র মেরামত চলছে’ স্লোগানটি জনপ্রিয় করে তুলেছিল। ২০২৪ সালের আন্দোলনেও এই একই আকাঙ্ক্ষা অর্থাৎ ভঙ্গুর রাষ্ট্রব্যবস্থাকে সংস্কার করার তীব্র ইচ্ছা সাধারণ মানুষের মধ্যে দেখা যায়। ২০১৮ সালের কিশোররাই ২০২৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যায়ে আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল।
খ. শৃঙ্খলার নতুন পাঠ: ২০১৮ সালের আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা দেখিয়েছিল যে সাধারণ নাগরিকরা চাইলে সর্বক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফেরাতে পারে। এই আত্মবিশ্বাস ২০২৪ সালে আন্দোলনকারীদের প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও সুশৃঙ্খল থাকতে এবং সাধারণ মানুষের সমর্থন আদায়ে সাহায্য করেছে।
গ. সাধারণ মানুষের একাত্মতা: নিরাপদ সড়ক আন্দোলনটিও কোনো রাজনৈতিক দলের ব্যানারে ছিল না, এটি ছিল সাধারণ শিক্ষার্থীদের। ঠিক একইভাবে ২০২৪ সালে আন্দোলনের শুরুতে যখন সাধারণ শিক্ষার্থীরা রাজপথে নামে, তখন অভিভাবক ও সাধারণ মানুষ খুব সহজেই তাদের সাথে একাত্ম হতে পেরেছিল।
ঘ. ভয় জয় করার প্রক্রিয়া: ২০১৮ সালের আন্দোলনে হেলমেট বাহিনী বা বিভিন্ন হামলার শিকার হয়েও শিক্ষার্থীরা রাজপথ ছাড়েনি। সেই অভিজ্ঞতা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই বোধ তৈরি করেছিল যে, দাবি আদায়ের জন্য রাজপথে টিকে থাকা জরুরি। ২০২৪ সালে এই ‘ভয় জয় করার’মানসিকতা আরও ব্যাপক আকারে ফুটে ওঠে।
ঙ. ডিজিটাল সংহতি: সামাজিক যোগাযাগ মাধ্যম ব্যবহার করে কীভাবে আন্দোলন সংগঠিত করতে হয় এবং সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে হয়, তার একটি সফল মহড়া হয়েছিল ২০১৮ সালে। ২০২৪ সালে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়ার পরও মানুষ যেভাবে তথ্য আদান-প্রদান করেছে, তার শেকড় লুকায়িত আগের ছিল আগের অভিজ্ঞতায়।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন ছিল একটি ‘মডেল’, যা সাধারণ মানুষকে অবহিত করতে পেরেছিল যে, তরুণ প্রজন্মের দাবির মধ্যে যৌক্তিকতা ও দেশপ্রেম থাকলে তা পুরো রাষ্ট্রের ভিত নাড়িয়ে দিতে পারে। ২০২৪ সালের আন্দোলনে সেই শক্তির প্রতিফলন ঘটেছে। তবে এখানে বলা প্রয়োজন যে, ২০১৮ সালের আন্দোলন ছিল পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ এবং ব্যাপক জনসমাবেশ ঘটলেও হিংসাত্মক ঘটনা বা রাষ্ট্রীয় সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটেনি। যা ২০২৪ সালে এসে পুরোপুরি ধ্বংস্বাত্মক রূপ গ্রহণ করে। ব্যাপক সন্ত্রাস, পুলিশ হত্যা, রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতিসাধন একসময় মুখ্য হয়ে উঠেছিল।
আন্দোলনকারীরা যে এই ব্যাপক ধ্বংসয্জ্ঞ ঘটিয়েছে তা নয়। আন্দোলনে কেন্দ্রীয়ভাবে কার্যকর নেতৃত্বের অভাব, আন্দোলনের ভেতর স্বাধীনতা বিরোধী ও জঙ্গিদের উদ্দেশ্যমূলক অনুপ্রবেশ এ্সব ঘটনার জন্যে দায়ী। কিছু ক্ষেত্রে সরকারের পেটোয়া বাহিনীও এসব ঘটনায় প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল। এখন জঙ্গিদের কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বীরত্বের সাথে এসব কাহিনি বর্ণনা করছেন। আবার আন্দোলনকারীদের মধ্যেও কেউ কেউ সশস্ত্র বিপ্লবের প্রস্তুতির কথাও বলছেন। এর মাধ্যমে তাদের সঠিক নেতৃত্ব প্রদান ও দূরদর্শিতার যে অভাব ছিল তা প্রকটভাবে প্রকাশিত। যা এই আন্দোলনের শহীদ ও আত্মদানকারীদের অর্জনকে ম্লান করার চেষ্টা বলে প্রতীয়মান হয়।
এসব কথা আরও একটি বিষয়ের ইঙ্গিত বহণ করে, ২০২৪ সালের আন্দোলন ২০১৮ সালের মতো শুধু দাবি আদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এবারে আন্দোলনকারীদের মধ্যে ক্ষমতালোভী একটি বা একাধিক গোষ্ঠী ঘাপটি মেরে সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। এ কারণে একপর্যায়ে দেশের অভিজ্ঞ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দও শংকিত হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু ছাত্র নেতারা এই পরিস্থিতিকে বাড়তে দেয়নি। তারা পরিস্থিতি সামাল দেয়া ও অর্জিত বিজয় ধরে রাখার জন্যে সর্বাত্মক চেষ্টা করেছে।
আসলে ভিন্ন ভিন্ন সময় নানা কারণে দেশের অভ্যন্তরে সংকটময় পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। আর এসবের জন্য দায়ী অসাধু প্রভাবশালী এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। এরা সবসময় ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে অভ্যস্ত। এরকম ঘটনা বিগত করোনা মহামারীর সময়ও দেখা গেছে। একদল নৈতিকতাহীন মানুষ কীভাবে দেশের সমস্যাকে পুঁজি করে নিজেরা লাভবান হয়। এদের মধ্যে সরকারের সাথে জড়িত ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা যেমন থাকে, তেমনি সরকারের সুবিধা ভোগীরাও এসব অনৈতিক কাজের সাথে জড়িত।
এক্ষেত্রে সরকারে করণীয় থাকলেও তারা নানাভাবে বিষয়টি পাশ কাটিয়ে যান। সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা তাদের কাছে গুরুত্ব পায় না। এরকম বহু ঘটনা উল্লেখ করা যায়। যেগুলো কেবল মাত্র সরকারের কার্যকর উদ্যোগের অভাবে যুগ যুগ ধরে কোনো মীমাংসা ছাড়াই পড়ে আছে। ফলে মানুষের মনে জন্ম নেয়া ক্ষোভ একসময় প্রতিবাদ হিসেবে সরকারের ভিত নাড়িয়ে দেয়।
(চলবে)