অনলাইন ডেস্ক: স্থানীয় সরকার নির্বাচন ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো এবার ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় সরকারের সব স্তরের নির্বাচনেও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন বা সন্ত্রাসবিরোধী আইনে অভিযুক্ত ব্যক্তি এবং পলাতক আসামিদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ বন্ধ রাখা হচ্ছে। একই সঙ্গে অনলাইনে মনোনয়নপত্র দাখিলের সুযোগও বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নতুন এই বিধানগুলো যুক্ত করে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন পরিচালনা ও আচরণবিধির সংশোধিত খসড়া চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন। আগামী সপ্তাহে জনমতের জন্য খসড়াটি কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। কমিশন সূত্রে জানা গেছে, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনসংক্রান্ত বিধিমালার খসড়াতেও একই ধরনের বিধান অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, কমিশনের পরবর্তী বৈঠকে খসড়াটি উপস্থাপন করা হবে। কমিশনের অনুমোদনের পর নাগরিক, অংশীজন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতের জন্য এটি উন্মুক্ত করা হবে।
নতুন খসড়ায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে আরও নির্দলীয় ও প্রার্থীভিত্তিক করার উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য বিদ্যমান ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর সংগ্রহের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রার্থীদের নির্বাচনী জামানতের পরিমাণ বাড়ানো হবে। নির্বাচনী প্রচারে পোস্টার ব্যবহারের দীর্ঘদিনের প্রচলিত সংস্কৃতিও বাদ দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) এবং পোস্টাল ব্যালট ব্যবহারের সুযোগও বাতিল করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব পরিবর্তন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের কাঠামো ও পরিচালনা পদ্ধতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে পোস্টার নিষিদ্ধকরণ পরিবেশ দূষণ কমাতে সহায়ক হতে পারে, তবে ডিজিটাল বা বিকল্প প্রচার পদ্ধতি কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এর আগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন বা সন্ত্রাসবিরোধী আইনে অভিযুক্ত ব্যক্তি এবং পলাতক আসামিদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। নতুন প্রস্তাবিত বিধিমালার মাধ্যমে সেই নীতিই স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও সম্প্রসারিত হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ইউপি নির্বাচন আচরণবিধির খসড়া ওয়েবসাইটে প্রকাশের পর নাগরিকদের মতামত দেওয়ার জন্য ১৫ দিনের সময় নির্ধারণ করা হবে। যদিও নির্বাচন নির্দলীয় ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হবে, তবুও রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকেও মতামত নেওয়া হবে। এ ছাড়া গণমাধ্যমের সঙ্গে মতবিনিময় এবং সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমে জনমত সংগ্রহ করা হবে।
মতামত গ্রহণ শেষে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সংযোজন-বিয়োজন করে খসড়াটি কমিশনের চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। এরপর আইনি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য পাঠানো হবে আইন মন্ত্রণালয়ে। ভেটিং সম্পন্ন হলে গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে নতুন বিধিমালা কার্যকর হবে।
বর্তমানে দেশে স্থানীয় সরকারের আওতায় রয়েছে ৪ হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৬১টি জেলা পরিষদ, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ, ৩৩০টি পৌরসভা এবং ১৩টি সিটি করপোরেশন। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ইউনিয়ন পরিষদগুলোর মধ্যে ৩ হাজার ৬৩২টির মেয়াদ আগামী আগস্টের মধ্যে শেষ হবে এবং আরও ৩৪৩টি পরিষদ ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের উপযুক্ত হবে।
তবে সব ইউনিয়ন পরিষদে একযোগে নির্বাচন আয়োজন সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে ১০৪টি ইউনিয়ন পরিষদ বিভিন্ন জটিলতার কারণে নির্বাচনের বাইরে রয়েছে। এর মধ্যে ৭৯টি ইউনিয়ন পরিষদ আইনি বিরোধ, ১৮টি সীমানা জটিলতা এবং সাতটি ভোটার তালিকা-সংক্রান্ত সমস্যার কারণে স্থগিত রয়েছে।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং বিতর্কমুক্ত করার লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন ধারাবাহিকভাবে নতুন সংস্কার উদ্যোগ নিচ্ছে। তবে এসব পরিবর্তনের কার্যকারিতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং ভোটারদের অংশগ্রহণের ওপর।
দ.ক.সিআর.২৬