নাহিদ আক্তার: সাংস্কৃতিকভাবে দীর্ঘদিন পিছিয়ে রাখা বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর জন্য প্রাথমিক শিক্ষায় সঙ্গীত, চিত্রকলা, নাট্যকলা ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় পদক্ষেপ।
বাংলাদেশের নিজস্ব এক সমৃদ্ধ সুর, শিল্পবোধ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে। কিন্তু ইউরোপীয় ও আরবীয় উপনিবেশিক প্রভাবের দীর্ঘ ইতিহাসের কারণে নতুন প্রজন্মকে ধীরে ধীরে সেই শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছে। আমাদের নিজস্ব কৃষ্টি, সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে উদযাপন করার ইচ্ছাশক্তিও বিভিন্নভাবে দমিয়ে রাখা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আমাদের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কূপ্রচার চালানো হয়েছে, যার ফলে নতুন প্রজন্ম নিজেদের সংস্কৃতি শেখার ও জানার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হয়েছে।
এদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় কখনোই নিজস্ব সংস্কৃতি সংরক্ষণ, প্রচার ও বিকাশকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। অতীতের কোনো সরকারই প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে সারাদেশে নাচ, গান, নাটক, চিত্রকলা, খেলাধুলা, শারীরিক শিক্ষা কিংবা লোকসংস্কৃতির বিকাশে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ করেনি। ফলে একটি জাতির আত্মপরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে।
সংস্কৃতি বহমান। এক সংস্কৃতি থেকে আরেক সংস্কৃতিতে সংস্কৃতির আদান প্রদান সবসময়ই ঘটে। বিদেশি সংস্কৃতি গ্রহণ করার মধ্যে খারাপ কিছু নেই। কিন্তু বিদেশি সংস্কৃতি গ্রহণ করতে গিয়ে নিজের সংস্কৃতিকে সম্পূর্ণ বিলীন করে দেওয়ার প্রবণতা একটি জাতির জন্য আত্মবিধ্বংসী হয়ে ওঠে। আমাদের দেশে বাংলা ভাষাকেও বহুসময় অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। ছোটবেলা থেকে শুনেছি বাংলা ভাষাকে “হিন্দুয়ানি ভাষা” বলা হতো। এভাবেই ভাষা থেকে শুরু করে আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পরিচয়কে দুর্বল করার অপচেষ্টা দীর্ঘদিন ধরে চলেছে।
একটি দেশের সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখতে হলে এবং সেই সভ্যতাকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে সাংস্কৃতিক বিপ্লব প্রয়োজন। আর সেই সাংস্কৃতিক বিপ্লব কেবল কিছু ঢাকা কেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান বা সীমিত উদ্যোগের মাধ্যমে সম্ভব নয়। সংস্কৃতিকে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে হবে।
আমাদের ছোটবেলায় বাংলাদেশের ছোট ছোট শহর ও মফস্বলেও নাচ, গান, চিত্রকলা, বাঁশি, যাত্রাপালা, বাউল, ভাটিয়ালি সহ নানা সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ ছিল। শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, সংগঠন ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে অংশ নিত। যাত্রাপালা হতো, লোকসংগীতের আসর বসত, শিল্পচর্চা ছিল মানুষের জীবনের স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু ধীরে ধীরে বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক উপনিবেশবাদ ও ভোগবাদী প্রভাবের মধ্যে পড়ে আমরা আমাদের অনেক কিছু হারিয়ে ফেলেছি।
এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষাক্ষেত্রে সংস্কৃতিচর্চাকে পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ বর্তমান সরকারের অন্যতম ইতিবাচক পদক্ষেপ। কারণ সংস্কৃতি শুধু বিনোদন নয়, এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়, মানবিকতা, সৃজনশীলতা ও সভ্যতার ভিত্তি।
দ.ক.সিআর.২৬