পারভেজ হাসান লাখাই: হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার শিক্ষা ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে পিছিয়ে রয়েছে। এর পেছনে শিক্ষকদের একাংশের উদাসীনতার অভিযোগ থাকলেও, অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এক ভিন্ন বাস্তব চিত্র। মূলত ভৌগোলিক অবস্থান, চরম যোগাযোগ বিপর্যয় এবং তীব্র শিক্ষক সংকটের কারণেই উপজেলার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারছে না। ‘মানুষ গড়ার কারিগর’ শিক্ষকেরা সময়মতো বাড়ি থেকে বের হলেও রাস্তাঘাট, গাড়ি ও নৌকার ‘চোর-পুলিশ’ খেলায় নষ্ট হচ্ছে ক্লাসের মূল্যবান সময়।
ভাটি অঞ্চলের যাতায়াত দুর্ভোগ: ইচ্ছা থাকলেও উপায় নেই
লাখাই উপজেলার অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভাটি অঞ্চলে অবস্থিত। অনেক শিক্ষক ক্যাচমেন্ট এরিয়ার (বিদ্যালয় এলাকা) বাইরে কিংবা ভেতরে বসবাস করলেও সময়মতোই স্কুলের উদ্দেশ্যে রওনা হন। কিন্তু যাতায়াত ব্যবস্থা এতটাই নাজুক যে, ঠিক সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো ভাগ্যর ওপর নির্ভর করে।
শিক্ষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, স্কুলে পৌঁছাতে তাদের একাধিকবার যানবাহন পরিবর্তন করতে হয়। প্রথমে কিছু পথ গাড়িতে, তারপর নৌকা এবং সবশেষে দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে যেতে হয়। এই যাতায়াত ব্যবস্থায় কোনো সমন্বয় নেই। গাড়ি পেতে সামান্য দেরি হলে নৌকা মিস হয়, আর নৌকা মিস করলেই বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে ২ থেকে ৩ ঘণ্টা দেরি হয়ে যায়। ইচ্ছা করে দেরি না করলেও, প্রতিদিন শিক্ষকদের এমন হাজারো প্রশ্নের ও জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে, যা তাদের মানসিক ও পেশাগত মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করছে।
ইউনিয়ন ভিত্তিক প্রধান সমস্যাগুলো:
বুল্লা ইউনিয়ন (সবচেয়ে ভুক্তভোগী):এই ইউনিয়নে যাতায়াত সমস্যা সবচেয়ে প্রকট। হেলাকান্দি, চাঁনপুর, ফরিদপুর ও মিরপুরসহ বিভিন্ন গ্রামের শিক্ষকদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। বুল্লাবাজার সংলগ্ন সূতাং নদীর ওপর কোনো ব্রিজ না থাকায় প্রতিদিন শত শত শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে নৌকার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়।
১ নং লাখাই ইউনিয়ন:এই ইউনিয়নের নদীর ওপারে অবস্থিত শিবপুরসহ বেশ কয়েকটি গ্রাম চরম অবহেলিত। সুনির্দিষ্ট যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় এখানকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিনিয়ত পিছিয়ে পড়ছে।
করাব ও মোরাকরি ইউনিয়ন:করাব ইউনিয়নের আগাপুর ও হরিণাকোনা হুসেনপুর সহ বেশ কয়েকটি গ্রামের রাস্তাঘাট কাঁচা ও চলাচলের অযোগ্য। ফলে শিক্ষকেরা সঠিক সময়ে ক্লাসে উপস্থিত হতে পারেন না।
দূরত্ব ও গাড়ি পরিবর্তনের ঝামেলা:কিছু কিছু এলাকায় রাস্তা থাকলেও দূরত্ব অনেক বেশি। ফলে বারবার গাড়ি পরিবর্তন করতে গিয়ে শিক্ষকেরা সময়মতো ক্লাসে যোগ দিতে হিমশিম খান। তবে এর মধ্যে কিছু কিছু এলাকায় রাস্তাঘাট ভালো থাকা সত্ত্বেও শিক্ষকদের ব্যক্তিগত অবহেলার কারণে দেরি হওয়ার নজিরও রয়েছে।
তীব্র জনবল ও শিক্ষক সংকট
যোগাযোগ ব্যবস্থার পাশাপাশি লাখাইয়ের শিক্ষা খাতের আরেকটি বড় ক্ষত হলো তীব্র জনবল সংকট। উপজেলার অনেক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকসহ মাত্র ২ থেকে ৩ জন শিক্ষক দিয়ে পুরো বিদ্যালয় চালানো হচ্ছে। আবার কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে বেশির ভাগই নারী শিক্ষক কর্মরত আছেন। দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে নারী শিক্ষকদের পক্ষে সঠিক সময়ে এবং নিরাপদে যাতায়াত করা আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ও কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। একজন শিক্ষককে একাধিক ক্লাস নিতে হওয়ায় শিক্ষার গুণগত মান ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
উত্তরণের উপায় ও স্থানীয়দের দাবি
শিক্ষা খাতে লাখাই উপজেলাকে এগিয়ে নিতে এবং এই অচলাবস্থা থেকে রেহাই পেতে স্থানীয় সচেতন মহল ও ভুক্তভোগী শিক্ষকেরা জরুরি ভিত্তিতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন-
সূতাং নদীতে ব্রিজ নির্মাণ: বুল্লাবাজার সংলগ্ন সূতাং নদীর ওপর একটি স্থায়ী ব্রিজ নির্মাণ করা এখন সময়ের দাবি। এই ব্রিজটি হলে শুধু শিক্ষা নয়, গোটা এলাকার জীবনযাত্রার মান বদলে যাবে।
লাখাই-শিবপুর ব্রিজ নির্মাণ:লাখাই ও শিবপুরের মধ্যকার যোগাযোগ স্থাপন ও ব্রিজ নির্মাণ করা জরুরি।
রাস্তাঘাট পাকাকরণ: করাব ইউনিয়নের আগাপুর-হরিণাকোনা হুসেনপুরসহ অবহেলিত গ্রামের রাস্তাগুলো দ্রুত পাকাকরণ করা প্রয়োজন।
শিক্ষক ও জনবল নিয়োগ: শূন্যপদগুলোতে দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে ভারসাম্য বজায় রাখা প্রয়োজন।
এলাকাবাসীর অভিমত: যোগাযোগ ব্যবস্থার এই মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধান না করে কেবল শিক্ষকদের ওপর দোষ চাপালে লাখাইয়ের শিক্ষার আলো জ্বলবে না। অবহেলিত এই যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও রাস্তাঘাটের কাজ সম্পন্ন হলে শিক্ষা সেক্টরসহ পুরো লাখাইয়ে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
দ.ক.সিআর.২৬