এস গোস্বামী: মৈত্রী এক্সপ্রেসের যাত্রা শুধু দুই দেশের ভৌগোলিক দূরত্বকে সংযুক্ত করে না, বরং মানবিক সম্পর্কের এক গভীর দার্শনিক প্রতিফলন ঘটায়। এই ট্রেনের কামরায় যখন শিক্ষার্থী, রোগী ও ব্যবসায়ীরা একসঙ্গে যাত্রা করেন, তখন তা প্রমাণ করে যে প্রতিবেশিত্ব কেবল রাজনৈতিক চুক্তি নয়—এটি একটি দৈনন্দিন দর্শন, যেখানে দুই জাতির আত্মা একই সাংস্কৃতিক নদীর ধারায় প্রবাহিত হয়। এস গোস্বামীর মূল ভাবধারাকে আরও গভীর করে দেখলে বোঝা যায়, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক একটি ঐতিহাসিক-দার্শনিক নির্মাণ, যা ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের রক্তে গড়া, কিন্তু বাস্তবতার চ্যালেঞ্জে নিয়ত পরীক্ষিত। এই সম্পর্কের স্থায়ী স্থাপত্য গড়তে হলে শুধু সাফল্যের গল্প নয়, বরং অসম্পূর্ণতা, অবিশ্বাস ও অসমতুল্যতাকেও স্বীকার করতে হবে।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক। প্রায় এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়া এবং যুদ্ধে সহায়তা করা দুই দেশের মধ্যে এক অবিস্মরণীয় বন্ধুত্বের ভিত্তি স্থাপন করে। কিন্তু দর্শনের দিক থেকে এটি শুধু রাজনৈতিক সহায়তা নয়—এটি ছিল স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও মানবতার যৌথ লড়াইয়ের প্রকাশ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যে জাতীয় সঙ্গীত দুই দেশকে এক করে, সেই ভাষা ও সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা আজও দার্শনিকভাবে সম্পর্ককে সমৃদ্ধ করে। তবু পঞ্চাশ বছর পর এই সম্পর্ককে শুধু আবেগ দিয়ে বিচার করলে চলবে না। বাস্তবতা জটিল: ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার পতনের পর সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য টানাপোড়েন দেখা দেয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ভিসা স্থগিত, বাণিজ্য সীমাবদ্ধতা, সীমান্ত উত্তেজনা এবং রাজনৈতিক বক্তব্যের আদান-প্রদান সম্পর্ককে চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দেয়। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর রিসেটের আশা জেগেছে, কিন্তু গভীর অবিশ্বাস এখনও রয়ে গেছে।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সম্পর্কের মেরুদণ্ড শক্তিশালী হলেও ভারসাম্যহীন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল, যা পরবর্তী বছরগুলোতে কিছুটা হ্রাস পায়। ভারত রপ্তানি করে তুলা, সুতা, কাপড় ও মসলা; বাংলাদেশ রপ্তানি করে চামড়া, পাট ও তৈরি পোশাক। কিন্তু বাণিজ্য ঘাটতি বাংলাদেশের জন্য চাপ সৃষ্টি করে। ভারতের ৮ বিলিয়ন ডলারের ঋণ সহায়তা অবকাঠামো গড়ে তুলেছে, তবু বাংলাদেশে ভারতীয় পণ্যের আধিপত্য নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। নতুন রুপি-ভিত্তিক বাণিজ্য ব্যবস্থা ডলার নির্ভরতা কমালেও, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে ভারতীয় সুতার নির্ভরতা একধরনের অসম আন্তনির্ভরশীলতা তৈরি করেছে। দার্শনিকভাবে এটি প্রশ্ন তোলে: সত্যিকারের অংশীদারিত্ব কি সমতার ওপর দাঁড়ায়, নাকি শক্তিশালী প্রতিবেশীর সহায়তায়? স্টার্টআপ ব্রিজের মতো উদ্যোগ আশা জাগায়, কিন্তু বাস্তবে ছোট দেশের উদ্যোক্তাদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।
জ্বালানি সহযোগিতা সম্পর্কের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। খুলনার রামপাল মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্ট (১৩২০ মেগাওয়াট) NTPC ও বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের যৌথ উদ্যোগ। ২০২৬ সালেও এটি বাংলাদেশের বিদ্যুৎ চাহিদায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ ভারত থেকে ১,১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করে এবং মৈত্রী পাইপলাইন জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়িয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার বিদ্যুৎ গ্রিডে নেপাল-ভুটান-ভারত-বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগসূত্র আঞ্চলিক সমৃদ্ধির স্বপ্ন দেখায়। কিন্তু চ্যালেঞ্জও আছে। বিদ্যুতের দাম, পরিবেশগত উদ্বেগ এবং চুক্তির পুনর্বিবেচনার দাবি নতুন সরকারের সময় উঠেছে। দর্শনের দিক থেকে এটি শিক্ষা দেয় যে জ্বালানি সহযোগিতা শুধু বিদ্যুৎ প্রবাহ নয়—এটি ন্যায্যতা ও স্থায়িত্বের প্রশ্ন।
যোগাযোগ বিপ্লবের ক্ষেত্রে ছয়টি আন্তঃসীমান্ত রেল সংযোগ, আগরতলা-আখাউড়া লাইন, খুলনা-মোংলা রেল এবং ইনল্যান্ড ওয়াটারওয়েজ প্রোটোকল সম্পর্ককে জীবন্ত রেখেছে। ভারতের দেওয়া রেলওয়ে ওয়াগন ও বাস রুট লজিস্টিকসকে শক্তিশালী করেছে। তবে ২০২৪-২৫ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতায় অনেক সংযোগ ব্যাহত হয়। মানুষের যাতায়াত কমে যায়, বাণিজ্য প্রভাবিত হয়। এখানে দার্শনিক প্রশ্ন: সংযোগ কি শুধু অবকাঠামো, নাকি আস্থার সেতু? আস্থা না থাকলে ট্রেন চললেও মানুষের মনে দূরত্ব বাড়ে।
প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা ক্ষেত্রে সম্প্রীতি ও বঙ্গসাগর মহড়া, প্রতিরক্ষা ঋণ এবং প্রশিক্ষণ সহযোগিতা পরিপক্বতার পরিচয় দেয়। কিন্তু সীমান্ত হত্যা, অনুপ্রবেশ এবং নিরাপত্তা উদ্বেগ (বিশেষ করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বিচ্ছিন্নতাবাদ ও জঙ্গিবাদ) সম্পর্ককে জটিল করে। ২০২৫ সালে অনুপ্রবেশের ঘটনা বেড়েছে। দর্শনের দিক থেকে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা হওয়া উচিত শান্তির জন্য, আধিপত্যের জন্য নয়।
মানবিক সম্পর্ক সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি। ২০২৪ সালে প্রায় ৪.৮২ লাখ বাংলাদেশি চিকিৎসায় ভারতে গেছেন। ভাষাগত ও ভৌগোলিক নৈকট্য এটিকে সহজ করে। আইসিসিআর স্কলারশিপ ও মুক্তিযোদ্ধা সন্তানদের স্কলারশিপ মানবিক বন্ধন গড়ে। কিন্তু সংখ্যালঘু সুরক্ষা, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার অভিযোগ ২০২৪-২৫ সালে সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এটি দার্শনিক চ্যালেঞ্জ: মানবিকতা কি শুধু চিকিৎসা ও শিক্ষায়, নাকি সকল নাগরিকের নিরাপত্তায়?
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তিস্তা ও গঙ্গা পানি বণ্টন। ১৯৯৬ সালের গঙ্গা চুক্তি ২০২৬ সালে মেয়াদ শেষ হচ্ছে। তিস্তা চুক্তি দীর্ঘদিন আটকে আছে পশ্চিমবঙ্গের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণে। এটি শুধু পানির প্রশ্ন নয়—এটি ন্যায়বিচার, আস্থা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন। জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে নদী ভাগাভাগি দুই দেশের কৃষি, জীবিকা ও পরিবেশকে প্রভাবিত করে। দার্শনিকভাবে নদীকে দেখতে হবে সীমান্তের বেড়া নয়, বরং জীবনের ধারা হিসেবে।
রাজনৈতিক পরিবর্তন সম্পর্কের স্থায়িত্বকে পরীক্ষা করে। হাসিনা আমলে ঘনিষ্ঠতা ছিল, কিন্তু তা একপেশে বলে সমালোচনা হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে অ্যান্টি-ইন্ডিয়া সেন্টিমেন্ট বেড়েছে, যা জাতীয়তাবাদী রাজনীতি ও ইসলামপন্থী প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত। ২০২৬ সালের পর নতুন সরকারের সঙ্গে রিসেট সম্ভব, কিন্তু হাসিনার ভারতে অবস্থান, এক্সট্রাডিশন ইস্যু এবং সংখ্যালঘু সুরক্ষা ছাড়া পুরোপুরি স্বাভাবিকীকরণ কঠিন।
ভবিষ্যতের দর্শন হওয়া উচিত “সমতার মৈত্রী”। দুই দেশকে বুঝতে হবে যে ছোট-বড় প্রতিবেশীর সম্পর্কে আস্থা সবচেয়ে বড় মূলধন। সীমান্ত হত্যা বন্ধ, পানি ন্যায়সঙ্গত বণ্টন, বাণিজ্য ভারসাম্য, সংখ্যালঘু সুরক্ষা এবং যৌথভাবে জলবায়ু মোকাবিলা—এগুলোই স্থায়ী স্থাপত্য গড়বে। মৈত্রী এক্সপ্রেসের যাত্রীরা যেমন নিজেরাই সিদ্ধান্ত নেয় পাশের দেশ তাদের সুযোগের জায়গা, তেমনি দুই দেশের নেতৃত্বকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে সম্পর্ক হবে পারস্পরিক সম্মান ও লাভের, নাকি সন্দেহ ও অসমতার।এই দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলা যায়, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক শুধু কূটনীতি নয়—এটি দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যতের আয়না। যদি দুই দেশ চ্যালেঞ্জগুলোকে সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করে, তাহলে এই সম্পর্ক হবে শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং একটি সভ্যতাগত মৈত্রী, যা আগামী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে। সাফল্যের গল্পগুলোকে ধরে রেখে, অসম্পূর্ণতাগুলোকে সংশোধন করে এগোলেই “সব ঋতুর সম্পর্ক” সত্যিকার অর্থে টেকসই হবে।
লেখক - এস গোস্বামী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও চিন্তক।
দ.ক.সিআর.২৬