কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি: কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে টানা বৃষ্টি, তুফান ও বজ্রপাতে পাকা বোরো ধান পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন হাজারো কৃষক। দুই দিন আগেও যেখানে সোনালী ধান বাতাসে দুলছিল, এখন সেখানে শুধু পানি আর পানির নিচে ডুবে থাকা স্বপ্নভাঙা ফসল।
অষ্টগ্রাম উপজেলার খয়েরপুর-আব্দুল্লাহপুর, আদমপুরসহ ইটনা ও মিঠামইনের বিস্তীর্ণ হাওরে অন্তত দুই হাজার হেক্টরের বেশি জমির পাকা ধান পানিতে তলিয়ে গেছে বলে কৃষকেরা জানিয়েছেন। কোথাও কোমরসমান পানি, কোথাও তারও বেশি। ধান কাটা তো দূরের কথা, অনেক কৃষক এখন মাঠেই নামছে না বজ্রপাতের আতঙ্কে।
হাওরের মাঠে গিয়ে দেখা যায়, কৃষকেরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ‘গলাডোবা’ ধান কেটে নৌকায় তুলছেন। কেউ কেউ আধা পাকা ধান কেটে কাদা-পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে সংগ্রহ করছেন। কিন্তু অধিকাংশ জমির ধান ইতিমধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে।
একই গ্রামের কৃষক রতন মিয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আর চার-পাঁচ দিন গেলেই ধান কাটতাম। এখন এক ছটাকও ঘরে তুলতে পারলাম না। পরিবার নিয়ে কীভাবে চলব জানি না।” তাঁর ১০ একর জমির ধানই এবার পানিতে ডুবে গেছে। এই ধান থেকেই পুরো পরিবারের জীবিকা চলত।
আরেক কৃষক কাবিল মিয়া ভেজা ধান হাতে নিয়ে বলেন, “ধানটা চোখের সামনে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কইলজাটা মানতে পারতেছি না।” কথা বলতে বলতে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।
একই গ্রামের হযরত আলী জানান, প্রতিবছরই উজান থেকে পানি নেমে এসে হাওরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করে। নদী ভরাট ও অপরিকল্পিত বাঁধের কারণে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
নজরুল ইসলাম জানান, তাঁর ৯ একর জমির মধ্যে সাত একরই তলিয়ে গেছে। বাকি জমিও পানির নিচে যাওয়ার শঙ্কায় আছে। ধানগাছ ইতিমধ্যে পচতে শুরু করেছে।
রমজান আলী বলেন, “দেড় লাখ টাকা ঋণ করে আবাদ করেছিলাম। ধান বিক্রি করে ঋণ শোধের কথা ছিল। এখন কীভাবে শোধ করব বুঝতে পারছি না।”
কৃষকেরা অভিযোগ করছেন, হাওরের প্রাকৃতিক পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি, নদী ভরাট, অপরিকল্পিত রাস্তা ও বাঁধ নির্মাণের কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় অল্প বৃষ্টিতেই হাওর ডুবে যাচ্ছে।
অন্যদিকে কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, পলি জমে নদীর প্রবাহ কমে যাওয়ায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। তবে ক্ষয়ক্ষতির সঠিক হিসাব পেতে আরও সময় লাগবে। তাঁদের মতে, ধান ৫ থেকে ৬ দিন পানিতে থাকলে ক্ষতি ব্যাপকভাবে বাড়ে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কিশোরগঞ্জে এবার প্রায় এক লাখ ৬৮ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর বড় অংশই হাওরাঞ্চলে।
হাওরের এই পরিস্থিতিতে কৃষকের চোখে এখন শুধু হতাশা আর অনিশ্চয়তা। সোনালী স্বপ্নের ধান এখন পানির নিচে, আর সেই সঙ্গে ভেসে যাচ্ছে বছরের পর বছরের পরিশ্রম, ঋণ আর জীবনের হিসাব।
দ.ক.সিআর.২৬