অজয় বিশ্বাস: ২০২৪ সালের গণআন্দোলন বাংলাদেশের সমকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বহুমাত্রিক ঘটনা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
এই আন্দোলনের মাধ্যমে একদিকে যেমন জনঅংশগ্রহণ, দাবি-দাওয়া এবং রাজনৈতিক সচেতনতার প্রকাশ ঘটেছে, অন্যদিকে সহিংসতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং বিচার প্রক্রিয়া নিয়েও বিতর্কও সমানভাবে সামনে এসেছে। ফলে, এই আন্দোলনটি কেবল একটি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয়; বরং এটি একটি জটিল সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতারই প্রতিফলন।
এই লেখার প্রধান উদ্দেশ্য হলো- ২০২৪ সালের গণআন্দোলনের পটভূমি, প্রকৃতি, অংশগ্রহণকারীদের ভূমিকা, রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিতর্কগুলিকে নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে জনসমক্ষে উপস্থাপন করা। বলতে গেলে বিশেষভাবে, আন্দোলনের ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় দিক পর্যালোচনার মাধ্যমে একটি ভারসাম্যপূর্ণ মূল্যায়ন উপস্থাপন করাই যুক্তিযুক্ত হবে বলে মনে হয়।
ছাত্র-গণআন্দোলনের উদ্ভবের পেছনে ক্রিয়াশীল ছিল একাধিক কারণ। রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক চাপ এবং বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্তকে ঘিরে জনমনে ধীরে ধীরে অসন্তোষ সঞ্চিত হতে থাকে। পাশাপাশি তরুণ সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক ব্যবহার আন্দোলনের বিস্তারকে ত্বরান্বিত করে। অন্যদিকে, আন্দোলনের সময় সংঘটিত সহিংসতা, সম্পদ বিনষ্ট এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ এই পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তোলে। এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া, বিচার প্রক্রিয়া এবং দায়বদ্ধতা নিয়ে সাধারণভাবে জনমনে বিভিন্ন প্রশ্ন ও মতভেদ তৈরি হয়। ফলে, এই আন্দোলন একদিকে যেমন গণআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবে দেখা যেতে পারে, একইসঙ্গে অন্যদিকে এর ফলাফল ও পদ্ধতি নিয়ে বিভিন্ন সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। দেশের সুশীল সমাজ, রাজনীতিবিদ ও বোদ্ধা জনগণের মনে এই সমালোচনার বিষয় উত্থাপিত হয়েছে।
এই ছাত্র-গণআন্দোলন যেমন দেশের বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, ছাত্র, সংস্কৃতিকর্মী এবং পেশাজীবীসহ সাধারণ মানুষের মনে এখনো নানা প্রশ্ন থাকলেও তারা সেগুলো উত্থাপন করার মতো অবস্থানে নেই। তবে এই আন্দোলনে দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনসহ সিংহভাগ সাধারণ মানুষের সমর্থন ছিল। কিন্তু কিছু বিষয়ে সেই সমর্থনকে এখন বেশির ভাগ মানুষই ভুল মনে করছেন। তারা মনে করছেন, এই আন্দোলনের পেছনে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী রাজনৈতিক শক্তি সক্রিয় ছিল বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর গোপন ইন্ধন।
আন্দোলনের পটভূমি, প্রেক্ষাপট, কারণ ও যৌক্তিকতা
এই ছাত্র-গণআন্দোলন এবং ছাত্র-জনতার স্বতস্ফুর্ত গণঅভ্যুত্থানের শুরুটি ছিল একটি ন্যায্য দাবি আদায়ের লক্ষ্য নিয়ে। এটা ছিল- সরকারি চাকরিতে বৈষম্যমূলক কোটা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবি। কিন্তু অবশেষে এই সাধারণ দাবিটি রূপ নিলো একটি পূর্ণাঙ্গ গণঅভ্যুত্থানের। সাধারণ শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই দেশের সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হয়। এর ফলশ্রুতিতে প্রচণ্ড আন্দোলনের মুখে দেড় দশকের শেখ হাসিনা সরকারের অবসান ঘটে।
২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে আগস্টের প্রথম সপ্তাহ। খুব বেশি সময় নয়, মাত্র ৩৬ দিনের মধ্যেই ক্ষমতাসীন সরকারের পতন ঘটে ‘এক দফা’ দাবির মুখে। তবে এই ছাত্র আন্দোলনটি ছিল বহুমাত্রিক। এটি শুধু একটি সরকারের পতন ঘটায়নি, এটি হয়ে উঠেছিল তরুণ প্রজন্মের সাহসের সমাচার এবং মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। কারণ, রক্তাক্ত জুলাইয়ের শেষ পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কারের দাবি থেকে সরে আসে। এরপর তাদের দাবি রূপ নেয়- এক দফায়, শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগ। ২০২৪ সালের এই যুগান্তকারী ঘটনা ‘জুলাই অভ্যুত্থান’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। আন্দোলনটি দৃশ্যমানভাবে শুরু হয়েছিল ৫ জুন। আর পরিণতি লাভ করে ৫ আগস্ট ২০২৪। সে কারণে প্রতীকীভাবে এটিকে বলা হয় ‘৩৬ জুলাই’। এই সময় সরকারি দমন পীড়নের কারণে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে।
আন্দোলনের প্রধান কারণ
সরকারি চাকরিতে ৫৬ শতাংশ কোটা (মুক্তিযোদ্ধার সন্তান/নাতি-নাতনি ৩০ শতাংশসহ) পুনর্বহালের বিরুদ্ধে ছাত্রদের অসন্তোষ, বেকারত্ব, অর্থনৈতিক সংকট, দুর্নীতি, একনায়কতন্ত্র ও ভোটাধিকার হরণের বিরুদ্ধে জনরোষ। ক্ষমতাসীন সরকারের কঠোর দমন নীতি (বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ছাত্রলীগ) ছাত্র আন্দোলনকে গণঅভ্যুত্থানে রূপ দেয়।
প্রধান প্রধান ঘটনাক্রম
৫ জুন, ২০২৪-এ হাইকোর্টের রায়ে কোটা বাতিল পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা এবং কোটা প্রথা পুনর্বহাল। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে ছাত্ররা বিক্ষোভ শুরু করে।
৬ জুন থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ মিছিল সংঘটিত হয়। সে সময়ের দাবি ছিল- কোটা প্রথা বাতিল।
১ জুলাই থেকে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু। এই সময় আন্দোলন রাজপথে ছড়িয়ে পড়ে। চলমান এসব কর্মসূচির মধ্যেই ১০-১২ জুলাই ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে শাহবাগ, রাজপথ ও মহাসড়ক অবরোধ করা হয়।
১৪ জুলাই শেখ হাসিনার বক্তব্যের প্রেক্ষিতে জনরোষ বৃদ্ধি পায়।
১৫ জুলাই থেকে পুলিশ ও ছাত্রলীগের হামলার কারণে সংঘর্ষ শুরু হয়, অর্থাৎ এই পর্যায়ে আন্দোলন সহিংস রূপ ধারণ করে।
১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদ পুলিশের শটগানের গুলিতে আহত হন। সে সময় তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তিনি মারা যান। (এই ঘটনা নিয়ে বিতর্ক আছে। আঘাতের ধরন ও পোস্টমর্টেম রিপোর্ট কয়েকবার করানো ইত্যাদি বিষয় নিয়ে। এ ছাড়া আরো বিতর্ক শুরু হয় যে, পুলিশের রাবার বুলেটে তার মৃত্যু হয়নি। কারণ, রাবার বুলেটে তার শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি বলে আদালতে তথ্য উপস্থাপন করা হয়) ফলে ছাত্র-জনরোষ বেড়ে যায় এবং আন্দোলন নতুন মোড় নেয়। এ সময় থেকে নিহতের সংখ্যা বাড়তে থাকে। এর মধ্যে পুলিশও রয়েছে।
১৭ থেকে ১৯ জুলাই: এসময় শহীদ আবু সাঈদের গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়া, ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া, ব্ল্যাক আউট ও কারফিউ জারি বহাল থাকে। এসময়ের হিসাবে সর্বোচ্চ নিহতের সংখ্যা একদিনেই বৃদ্ধি পায়। বিভিন্ন সূত্র একদিনে ৭৫ জনের মৃত্যু উল্লেখ করে।
২১ জুলাই: সুপ্রিম কোর্টের অ্যাপিলেট ডিভিশন কোটা ৯৩ শতাংশ করে (৭ শতাংশ কোটা মুক্তিযোদ্ধাসহ অন্যদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়)। কিন্তু ছাত্ররা এতে অসন্তোষ প্রকাশ করে এবং আন্দোলন অব্যাহত রাখে।
৩১ জুলাই- ৩ আগস্ট: ছাত্র আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। এই সময় সরকার পতনের দাবি ওঠে এবং অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়া হয়।
৪ আগস্ট: ‘মার্চ টু ঢাকা’ ঘোষণা দেওয়া হয়। এ ঘোষণার পর সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। সেনাবাহিনী এ সময় কোনো ভূমিকা পালন করা থেকে বিরত থাকে। এদিন সহিংসতায় ৯০ জনের বেশি নিহত হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রের দাবি।
৫ আগস্ট ২০২৪: দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি নতুন ইতিহাস তৈরি হয়। শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন। এদিকে, আন্দোলনকারীরা গণভবন, জাতীয় সংসদ ভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রবেশ করে আনন্দ প্রকাশ করে এবং এসব জায়গা থেকে লুটপাট করে বিভিন্ন জিনিসপত্র নিয়ে যায়।
৮ আগস্ট ২০২৪: ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে অন্তবর্তীকালীন সরকার গঠন করা হয়।
২০২৫ সালে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। এ সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে। বিশেষ করে থানার মধ্যেই পুলিশ পুড়িয়ে হত্যা, সংখ্যালঘুদের ওপর অমানবিক সন্ত্রাসী হামলা, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষকদের ‘আওয়ামী লীগ’ তকমা দিয়ে অপমানজনকভাবে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়।
এ সময় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হামলা ও লুটতরাজ, ‘ছাত্রলীগ’ তকমা দিয়ে প্রতিবন্ধী তোফাজ্জলকে নৃশংসভাবে হত্যা, ধর্মীয় উত্তেজনা সৃষ্টির মাধ্যমে সংখ্যালঘু নির্যাতন ও হত্যা, বিশেষ করে দিপু দাস নামে একজনকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। এ সব ভয়ানক ঘটনা ঘটে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’কে বিলুপ্ত করে ‘জাতীয় নাগরিক শক্তি’ (এনসিপি) ও ইনকিলাব মঞ্চের উগ্র সমর্থকদের কারণে। এ দুটি সংগঠনের গঠনের পেছনে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী জামায়াতে ইসলামীর সক্রিয়া সহযোগিতায়।
এসব ঘটনার কারণে মানুষের মনে ভীতি ও হতাশার সৃষ্টি হয়, যা গণমানুষের অভ্যুত্থানের অর্জনকে ম্লান করে দেয়। এসময় অন্তর্বর্তী সরকার নীরব ভুমিকা পালন করে। সেনাবাহিনী মাঠে থাকলেও তাদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত হতাশাজনক।
(চলবে)