মোঃ রোকনুজ্জামান শরীফ: বাংলাদেশ প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে ঘেরা এক সম্ভাবনাময় ভূখণ্ড। সবুজে মোড়া গ্রাম, নদীমাতৃক জীবন, উর্বর মাটি আর প্রাণবন্ত মানুষের দেশ এটি। এমন দেশ পৃথিবীতে খুব বেশি নেই, যেখানে প্রকৃতি এত উদার, মানুষ এত পরিশ্রমী, আর সংস্কৃতি এত সমৃদ্ধ। তবুও একটি প্রশ্ন বারবার সামনে আসে—কেন এই দেশের মানুষ সুখ ও শান্তির খোঁজে বিদেশে পাড়ি জমায়?
এর উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের বাস্তবতার দিকে তাকাতে হয়। মানুষ কেবল অর্থের জন্য দেশ ছাড়ে না; বরং নিরাপত্তা, সম্মান, ন্যায্যতা এবং স্থিতিশীল জীবনের নিশ্চয়তা খোঁজে। স্বাস্থ্য নিরাপত্তা, জননিরাপত্তা, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, সামাজিক নিরাপত্তা—এই মৌলিক ভিত্তিগুলো যখন দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন মানুষ বিকল্প পথ খোঁজে। আইনের শাসন যদি দৃঢ় না হয়, সমান অধিকার যদি নিশ্চিত না হয়, তাহলে মানুষের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়। আর এই আস্থাহীনতাই অনেককে দেশত্যাগে প্ররোচিত করে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার বিশাল জনসংখ্যা। এই জনসংখ্যাকে যদি সঠিকভাবে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করা যায়, তাহলে সেটিই হয়ে উঠতে পারে দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। শিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং কর্মসংস্থানের মাধ্যমে এই জনশক্তিকে জনসম্পদে পরিণত করা সম্ভব। তখন দেশের অর্থনীতি যেমন শক্তিশালী হবে, তেমনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে। কিন্তু এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন একটি দৌলতমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত সমাজব্যবস্থা। দুর্নীতি একটি দেশের শিকড়কে ধীরে ধীরে ক্ষয় করে দেয়। এটি মানুষের অধিকার কেড়ে নেয়, ন্যায্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং উন্নয়নের পথকে বাধাগ্রস্ত করে। যখন একজন সাধারণ মানুষ তার প্রাপ্য অধিকার পেতে ঘুষ দিতে বাধ্য হয়, তখন সে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা হারায়। তাই একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এই প্রক্রিয়ার অন্যতম প্রধান শর্ত। আইন যদি সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য না হয়, তাহলে সমাজে বৈষম্য তৈরি হয়। একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি যদি আইনের ঊর্ধ্বে থাকে, আর সাধারণ মানুষ যদি বিচার না পায়, তাহলে সেই রাষ্ট্র কখনোই টেকসই উন্নয়ন অর্জন করতে পারে না। তাই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, বিচারব্যবস্থাকে স্বাধীন ও কার্যকর করা—এগুলো অপরিহার্য।
একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। একজন নাগরিক যখন শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বাসস্থান এবং কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা পায়, তখন তার মধ্যে দেশপ্রেম আরও গভীর হয়। সে দেশের উন্নয়নে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে চায়। বিপরীতে, যখন সে নিজেকে অবহেলিত মনে করে, তখন তার মন বিদেশমুখী হয়ে ওঠে।
স্বাস্থ্য খাতেও বড় ধরনের উন্নয়ন প্রয়োজন। মানুষ যদি নিজের দেশে উন্নত চিকিৎসা না পায়, তাহলে সে বাধ্য হয়ে বিদেশে যায়। অথচ এই খাতটি উন্নত করা গেলে বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশের ভেতরেই থেকে যেত এবং মানুষের ভোগান্তিও কমত। একইভাবে, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে মানুষ নির্ভয়ে জীবনযাপন করতে পারত, যা একটি সুস্থ সমাজ গঠনের জন্য অপরিহার্য।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও কম নয়। তৈরি পোশাক শিল্প, প্রবাসী আয়, কৃষি খাত—সব মিলিয়ে অর্থনীতির একটি শক্ত ভিত্তি ইতোমধ্যেই তৈরি হয়েছে। এখন প্রয়োজন এই অর্জনকে আরও বিস্তৃত করা এবং সুষমভাবে বণ্টন করা। যাতে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষও উন্নয়নের সুফল পায়।
সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশ একটি সম্ভাবনার নাম। এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে আমাদের প্রয়োজন সুশাসন, নিরাপত্তা এবং ন্যায্যতার ভিত্তিতে একটি শক্ত রাষ্ট্র কাঠামো গড়ে তোলা।
যখন মানুষ তার অধিকার পাবে, নিরাপত্তা অনুভব করবে এবং সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারবে—তখন আর কেউ বিদেশে পাড়ি জমাতে চাইবে না। বরং সবাই নিজ দেশের মাটিতেই স্বপ্ন গড়তে চাইবে। সেই দিনই বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে—একটি উন্নত, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট
দ.ক.সিআর.২৬