জিয়াউর রহমান সাজন, শায়েস্তাগঞ্জ: হবিগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ভৌগোলিক এলাকায় ২৮ মাসে ২৬৩ টি বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার চুরি ও ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এবং ট্রান্সফরমার খুলতে গিয়ে গত চার বছরে বিদ্যুৎ স্পৃষ্ট হয়ে তিন জনের মৃত্যু হয়েছে।
সর্বশেষ গত সোমবার দিবাগত গভীর রাতে হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর উপজেলার নোয়াপাড়া চা বাগানের সেচ পাম্প হাউজে আগুন দিয়ে এবং দুই পাহারাদারকে হাত-পা বেঁধে তিনটি ট্রান্সফরমারের ভেতর কয়েল ও তামার তার সহ প্রায় সাত লাখ টাকা মূল্যের মালামাল লুটে নেয় ডাকাত দল। বেশির ভাগ ট্রান্সফরমার চুরি চুনারুঘাট উপজেলার দেউন্দি চা বাগান, লাল চান্দ চা বাগান ও নোয়াপাড়া চা বাগানে।
ডাকাতির ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও পরবর্তী আইনগত অগ্রগতি দৃশ্যমান না হওয়ায় ডাকাতরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এসব চুরির সঙ্গে হবিগঞ্জ জেলার ৯টি উপজেলায় ভাঙ্গারি ব্যবসায়ীদের জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
পূর্বে চুনারুঘাট উপজেলার দেউন্দি চা বাগান ও লাল চান্দ চা বাগানে ট্রান্সফরমার চুরি বিষয়ে চুনারুঘাট থানায় বেশ কয়েকটি অভিযোগ দিলেও কোনো অগ্রগতি নেই । বেপরোয়া ভাবে বাগানে ট্রান্সফরমার চুরি ও বাংলোতে ডাকাতি হচ্ছে।
এদিকে নোয়াপাড়া চা বাগানের ব্যবস্থাপক সোহাগ মাহমুদ থানায় লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেন, সোমবার গভীর রাত দেড়টার দিকে বাগানের ২৩ নম্বর সেকশনে প্রচুর বৃষ্টি শুরু হলে বাগানের দুই পাহারাদার শিপেন ব্যানার্জি ও জ্যোতিষ তেলেঙ্গা সেচ পাম্প হাউজের ভিতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে। রাত আড়াইটার সময় ১০ থেকে ১২ জনের মতো মুখোশধারী ডাকাত দল ফোম জাতীয় বস্তুতে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে জানালা দিয়ে নিক্ষেপ করে। এতে পাহারাদারের বিছানায় আগুন ছড়িয়ে পড়লে তারা দরজা খুলতে বাধ্য হন। এ সুযোগে ডাকাত দল পাহারাদারকে হাত-পা বেঁধে ৩৭.৫ কেভি ক্ষমতা সম্পন্ন তিনটি ট্রান্সফরমারের ভেতরে থাকা কয়েল ও তামার তার খুলে নেয় এবং পাহারাদারের মোবাইল ফোন আগুনে পুরিয়ে দেয়। ঘটনার খবর পেয়ে বাগানের কর্মকর্তা ও শ্রমিকরা ঘটনাস্থল থেকে পাহারাদারকে উদ্ধার করে মাধবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন।
এর আগে গত ৯ মার্চ গভীর রাতে পর পর ২-৩ বার চুনারুঘাট উপজেলার দেউন্দি চা বাগান, লাল চান্দ চা বাগানের মতো নোয়াপাড়া চা বাগানে তিন পাহারাদার কে হাত-পা বেঁধে সেচ পাম্প থেকে ১২টি ট্রান্সফরমার লুটে নেয় ডাকাত দল। যখন ট্রান্সফরমার চুরি হয় চুনারুঘাট থানা পুলিশ ও মাধবপুর থানা পুলিশ পাহারাদারকে থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দেয় কিন্তু ডাকাত দল এখন পর্যন্ত ধরা হয়নি।
দেউন্দি চা বাগান সূত্রে জানা যায়, দেউন্দি চা বাগানে গভীর রাতে বাগানের পাহারাদার পিক-আপ সহ তিনজনকে আটক করে চুনারুঘাট থানায় পুলিশের হাতে তুলে দিলে পুলিশ আটককৃত তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দেয়। এদিকে গত ২৫ মার্চ গভীর রাতে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নে গঙ্গানগর এলাকায় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সচল লাইন থেকে ট্রান্সফরমার খুলতে গিয়ে জামাল মিয়া নামে এক যুবক বিদ্যুৎ পৃষ্ঠ হয়ে নীচে পড়ে মৃত্যু বরণ করে। পরে পুলিশ এসে মরদেহ উদ্ধার করে হবিগঞ্জ সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। জামাল মিয়া হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার মিরপুর ইউনিয়নের মির্জাটুলা গ্রামের আব্দুল মতিনের পুত্র।
এর আগে ২০২২ সালে ৬ জানুয়ারি ভোর রাতে আজমিরীগঞ্জ উপজেলার শিবপাশা গ্রামের সচল লাইনে ট্রান্সফরমার চুরি করতে ঝুলন্ত অবস্থায় দুই তরুণের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ জানায়, রাতে বৈদ্যুতিক খুঁটির উপর ট্রান্সফরমার চুরি করতে উঠলে বিদ্যুৎ পৃষ্ঠ হয়ে তাদের মৃত্যু হয়। শিবপাশা গ্রামটি ভাঙ্গারি ব্যবসায়ী অধ্যুষিত। ওই ঘটনার পর অভিযোগ ওঠে, হবিগঞ্জ জেলার ৯ টি উপজেলায় ৫ শতাধিক অসৎ বেশ কিছু ভাঙ্গারি ব্যবসায়ী জড়িত রয়েছে।
এদিকে গত ২০২২ সালে ৫ জুলাই গভীর রাতে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের উপ-পুলিশ পরিদর্শক (এস আই) দ্রুবেশ চক্রবর্তী গোপন সংবাদ পেয়ে তার নেতৃত্বে একদল পুলিশ টিম চুনারুঘাটের দেউন্দি চা বাগান থেকে লাল চান্দ চা বাগান পর্যন্ত টহলরত অবস্থায় একটি মুখোশধারী ডাকাত দল লাল চান্দ চা বাগানে ডাকাতির প্রস্তুতি কালে আঃন্তজেলা ডাকাত দলের ৫ সদস্যকে হাতে নাতে আটক করে।
ডাকাতরা হলেন,চুনারুঘাট উপজেলার গাভিগাও গ্রামের মৃত ময়না মিয়ার ছেলে শাহিন মিয়া (৩২), পাইকপাড়া ইউনিয়নের বদরগাজী গ্রামের আব্দুল মতিনের ছেলে আজমান আলী (৩৫), কাঠাল বাড়ি এলাকার বিশ উল্লা ছেলে শামসুল হাই (৩৫), হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের সুঘর গ্রামের মোঃ আব্দুল কদ্দুস মিয়ার ছেলে ফারুক মিয়া (৪৫) ও বানিয়াচং উপজেলার কাগাপাশা ইউনিয়নের উজিরপুর গ্রামের মস্তুফা মিয়ার ছেলে তুহিন মিয়া (৩২)। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন জেলার উপজেলায় অসংখ্য ডাকাতি মামলা রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।
অপর দিকে গত ২০২৪ সালের ২ নভেম্বর গভীর রাতে চুনারুঘাটের বদরগাজী গ্রামে ও দেউন্দি চা বাগানে ডাকাতির প্রস্তুতি কালে ৩ ডাকাতকে আটক করে স্থানীয় জনতা, চা শ্রমিক এবং থানা পুলিশ। আটককৃত ডাকাত দলের কাছ থেকে দাঁড়ালো দা, ট্রান্সফরমার কাটার যন্ত্র ও গ্রিল কাটার সরঞ্জাম উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। ডাকাতরা বাগানের ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনা শিকার করছে পুলিশের কাছে।
ডাকাতরা হলো- চুনারুঘাট উপজেলার শানখলা ইউনিয়নের পঞ্চাশ গ্রামের মৃত নিম্বর আলীর ছেলে মিজানুর রহমান (২৮) ও সিলেট জেলার জকিগঞ্জ উপজেলার মানিকপুর এলাকার মৃত আসাদুর রহমানের ছেলে ফয়সল আহমেদ (৩৫) এবং একই উপজেলার মাতার গ্রামের মৃত আব্দুর রহিমের ছেলে ছালিক আহমেদ (৩২)। ২০১৯ সালে লাল চান্দ চা বাগানে বড় বাংলো ম্যানেজার সহ পরিবার কে মারধর ও রক্তাক্ত করে মালামাল লুট করে ডাকাত এবং আবার কয়েক দিন পর দেউন্দি চা বাগানে ডাক্তার বাংলোতে পাহারাদার কে হাত-পা বেঁধে বাংলোর মালামাল লুট করে নিয়ে যায় মুখোশধারী ডাকাতরা।
এদিকে চলতি বছর ২২ ফেব্রুয়ারি মাধবপুর উপজেলার নোয়াপাড়া ইউনিয়নের রতনপুর এলাকায় গভীর রাতে বৈদ্যুতিক লাইনের খুঁটি থেকে ট্রান্সফরমার খোলার সময় পথচারী লোকজন আটক করে মাধবপুর থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। আটককৃত ডাকাত নোয়াপাড়া ইউনিয়নের বেঙ্গেডুবা গ্রামের হেলাল উদ্দিনের ছেলে মোঃ শরীফ উদ্দিন (৩০) এবং তার সাথে সংঘবদ্ধ চক্র অজ্ঞাত ৬ - ৭ জন পালিয়ে যায়।
হবিগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সদর দপ্তর শায়েস্তাগঞ্জের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) মোঃ জিল্লুর রহমান জানান , চুনারুঘাট, মাধবপুর ও বাহুবল উপজেলায় যে পরিমাণ চা বাগানের ট্রান্সফরমার চুরি করেছে দুঃখ জনক। এধরণের চা বাগানের ট্রান্সফরমার চুরি হলে ভবিষ্যৎতে চা শিল্প বন্ধ হয়ে যাবে।
এছাড়া জেলার বিভিন্ন গ্রাম সহ চা বাগান নিয়ে ২০২৫ সালে ২৫৫ টি এবং চলতি বছর দেউন্দি চা বাগানে ৮ টি, লাল চান্দ চা বাগান ২ টি ও নোয়াপাড়া ৪ টি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে। প্রায় প্রতিটি ঘটনায় প্রত্যেক বাগান কর্তৃপক্ষ থানায় অভিযোগ দেওয়া আছে কিন্তু থানা পুলিশের কোনো ভূমিকা নেই। তবে থানা পুলিশের তদন্তে তেমন কোনো অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায় না।
সর্বশেষ নোয়াপাড়া চা বাগানের ঘটনায় মামলা এফআইআর ভুক্ত হয়েছে জানিয়ে মাধবপুর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) গোলাম মোস্তফা বলেন, নোয়াপাড়া চা বাগানে ডাকাতির সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
দ.ক.সিআর.২৬