অজয় বিশ্বাস: মরমী কবি, শিল্পী, সুরকার ও সঙ্গীতজ্ঞ বাউল রাধারমণ দত্ত ১৮৩৩ সালে (১২৪০ বঙ্গাব্দে) সিলেটের সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার কেশবপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্বপুরুষ আনন্দ শাস্ত্রী ছিলেন সপ্তম শতকে ত্রিপুরাধিপতিক ‘ধর্ম ফাঁ’ কর্তৃক মিথিলা থেকে আনীত পাঁচ ব্রাহ্মণের একজন। আনন্দ শাস্ত্রীর প্রো-পৌত্র নিধিপতি শাস্ত্রীর পুত্র ভানু নারায়ণ তৎকালীন মনুকুল প্রদেশে ‘ইটা’নামক রাজ্যের স্থপতি। ভানু নারায়ণের চার পুত্রের মধ্যে রামচন্দ্র নারায়ণ বা ব্রহ্ম নারায়ণের একপুত্র ছিলেন প্রভাকর। মুঘল সেনাপতি খোয়াজ উসমান দ্বারা ইটা রাজ্য অধিকৃত হলে এই রাজ বংশের সদস্যরা পালিয়ে গিয়ে আশেপাশে আশ্রয় গ্রহণ করেন।
এ সময় প্রভাকর দত্ত তাঁর পিতার সাথে আলিসারকুল চলে যান এবং সেখানে কিছুদিন বসবাস করার পর তৎকালীন জগন্নাথ পুর রাজ্যে এসে আশ্রয় নেন। কিছুদিন পর জগন্নাথপুর রাজ্যের অধিপতি রাজা বিজয় সিংহের অনুমতিক্রমে প্রভাকর জগন্নাথপুরের কেশবপুর গ্রামে বাড়ি নির্মাণ করে বসবাস শুরু করেন। পরবর্তীতে রাজা বিজয় সিংহ প্রভাকরের পুত্র সম্ভু দত্তকে মন্ত্রী নিয়োগ করেন। তারপর বানিয়াচংএর রাজা গোবিন্দ খা বা হাবিব খার সাথে বিবাদের কারণে জগন্নাথপুর রাজ বংশের বিপর্যয়ের প্রেক্ষিতে রাজ আশ্রিত কর্মচারিরাও দৈন্য দশায় পতিত হন।
এসময় সম্ভু দত্তের পুত্র রাধামাধব দত্ত অন্যের দ্বারস্ত না হয়ে সাহিত্য চর্চায় মনোনিবেশ করেন। বংশের ঐতিহ্য রাধামাধব দত্তকে সঙ্গীত ও সাহিত্যের প্রতি আকৃষ্ট করে। জন্মসূত্রে রাধারমণের পুরো নাম রাধারমণ দত্ত পুরকায়স্ত। পরে তারা ‘পুরকায়স্ত’পদবী পরিবর্তন করেন। তাঁর পিতা রাধামাধব দত্ত ছিলেন একজন প্রখ্যাত কবি, যিনি জয়দেবের ‘গীতগোবিন্দ-এর বাংলা অনুবাদ করেছিলেন। তাঁর রচিত গন্থের মধ্যে রয়েছে, গীতগোবিন্দ (জয়দেবের সংস্কৃত গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ), ভ্রমর গীতিকা, ভারত সাবিত্রী, সূর্যব্রত পাঁচালী, পদ্মপুরাণ ও কৃষ্ণলীলা গীতিকাব্য। এই গ্রন্থগুলোর মধ্যে গীতগোবিন্দের বাংলা অনুবাদ তাঁকে বিশেষ খ্যাতি এনে দিয়েছিল।
পিতার পথ ধরে সাহিত্য ও সঙ্গীতে রাধারমণের যাত্রা শুরু। এই নিবন্ধে কবি রাধারমণ দত্তের বংশপরিচিতি উল্লেখ করার কারণ, দেশের লোকসংস্কৃতির একজন পুরোধা হিসেবে তাঁর বংশ পরিচয় আগামী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা। কারণ রাধারমণের সৃষ্টির পাশাপাশি তাঁর ব্যক্তি জীবন সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। তাই এই প্রয়াস।
পিতার সঙ্গীত সাধনা এবং সাহিত্য ভাবনা রাধারমণকে শৈশব থেকেই প্রভাবিত করে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে ১২৫৯ বঙ্গাব্দে(১৮৪৩ সাল) অল্প বয়সে তিনি পিতৃহারা হন। তারপর থেকে মা সুবর্ণা দেবীর তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠেন। এসময়ে পিতার রচিত গ্রন্থগুলো তাঁর কাছে আদর্শ হয়ে ওঠে। রাধারমণের শৈশব কেটেছে সংগীত ও সাহিত্যের পরিবেশে। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে পিতার সাহিত্য ও সংগীতের প্রতি ভালোবাসা তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে এবং শৈশব থেকেই বৈষ্ণব সহজিয়া দর্শন ও সংগীতের প্রতি আকৃষ্ট হন। নীচে তাঁর গানে বিভিন্ন দর্শনের প্রভাব এবং সমন্বয় নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো।
রাধারমণের গানে বৈষ্ণব সহজিয়া দর্শনের প্রভাব
বৈষ্ণব সহজিয়া দর্শন একটি ভক্তিমূলক ও রহস্যবাদী আধ্যাত্মিক ধারা, যা মধ্যযুগীয় বাংলার গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের একটি পৃথক শাখা হিসেবে গড়ে উঠেছিল। এটি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর ভক্তিমার্গের সঙ্গে সহজিয়া দর্শনের (সহজ পথের দর্শন) সমন্বয়ে গঠিত। সহজিয়া শব্দটি এসেছে ‘সহজ’থেকে, যার অর্থ সরল বা স্বাভাবিক। এই দর্শনের মূল লক্ষ্য হলো সহজ, স্বাভাবিক ও সরল পথে ঈশ্বরের সাথে মিলন। মরমী কবি রাধারমণ প্রধানত বৈষ্ণব সহজিয়া দর্শনকে ভিত্তি করেই তাঁর গান রচনা করেছেন। সর্বক্ষেত্রেই তিনি সহজিয়া বৈশিষ্টের মধ্যে থেকেই সৃষ্টি করেছেন তাঁর অমূল্য রচনা। তাঁর গানের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি বৈষ্ণব সহজিয়া দর্শনকে অবলম্বন করে বাউল দর্শনকে আত্মস্ত করেছেন এবং অন্যান্য দর্শনের সমন্বয় সাধন করেছেন।
তিনি সুফিবাদ, বৌদ্ধ সহজিয়া দর্শন এবং বৈষ্ণব সহজিয়া দর্শনের মধ্যে একটি মেলবন্ধন তৈরি করেছেন। এটা তাঁর স্বকীয়তা। কিন্তু তা সত্বেও তিনি শাস্ত্রীয় গণ্ডির বাইরে যাননি। সাধক হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন সাধনা করেছেন। তারপর বিশ্বের সকল সহজিয়া দর্শন আত্মস্ত করে নিজের বৈশিষ্ট্য এবং শৈলী দিয়ে তাঁর গানকে জনপ্রিয় করে তুলেছেন। এটা তাঁর বিশেষ কৃতিত্ব এবং মৌলিকত্ব। যা সাধারণত সাধারণত চোখে পড়ে না।
রাধারমণ দত্ত বৈষ্ণব সহজিয়া ঘরানার একজন কৃতি ব্যক্তিত্ব। তাঁর প্রায় সব গানেই এই ধারার প্রভাব রয়েছে। তবে এর পাশাপাশি সুফি দর্শন, বৌদ্ধ সহজিয়া দর্শন, বাউল দর্শন এবং সর্বোপরি প্রেম, ভক্তি, বিরহ ও ঈশ্বরের সাথে মিলনের আকুলতা তাঁকে অসাধারণ করে তুলেছে। তাই এসব দর্শন নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন। কারণ এসব দর্শনের মূল গন্তব্য এক ও অভিন্ন, পরমাত্মার সান্নিধ্যলাভ। বৈষ্ণব সহজিয়া দর্শনের একটি ভক্তিমূলক ও রহস্যবাদী আধ্যাত্মিক ধারার মূলভিত্তি হলো রাধা-কৃষ্ণের প্রেম। আর এই প্রেম ঐশ্বরিক প্রেমের সর্বোচ্চ রূপ। এই প্রেমকে তারা মানবজীবনের মাধ্যমে অনুকরণ ও অনুভব করতে চান। তাই রাধা-কৃষ্ণের প্রেমকে প্রতীকীভাবে মানুষের আত্মা ও পরমাত্মার মিলনের রূপ হিসেবে দেখা হয়।
দেহতত্ত্ব ও সাধনা: সহজিয়ারা বিশ্বাস করেন যে মানবদেহই হলো ঈশ্বরের মন্দির। দেহের মধ্যেই ঐশ্বরিক উপস্থিতি খুঁজে পাওয়া যায়। তাঁরা দেহের শারীরিক ও আধ্যাত্মিক শক্তিকে যেমন কুণ্ডলিনী বা সুক্ষ শক্তি সাধনার মাধ্যমে জাগ্রত করার চেষ্টা করেন। সাধনায় প্রায়শই প্রেম ও শারীরিক সম্পর্ককে ঐশ্বরিক মিলনের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এই প্রেম সাধনা ‘পরকীয়া’ ভাবের উপর ভিত্তি করে, যেখানে সাধক-সাধিকার সম্পর্ক রাধা-কৃষ্ণের প্রেমের প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখানো হয়েছে।
সহজ পথ: সহজিয়ারা জটিল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান বা শাস্ত্রীয় বিধিনিষেধের পরিবর্তে সরল ও স্বাভাবিক পথের উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তাদের মতে, ঈশ্বরলাভের জন্য জ্ঞান, যোগ বা তপস্যার চেয়ে ভক্তি ও প্রেমই অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ।
[চলবে...]