কালনেত্র প্রতিবেদন: সারাদেশে হামের সংক্রমণ আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা বিগত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বর্তমানে ৫৬টিরও বেশি জেলায় হাম ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিনিয়তই হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে শিশু ভর্তি হওয়ায় অভিভাবকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম সংক্রামক ভাইরাসগুলোর মধ্যে একটি। এই ভাইরাসটি আক্রান্ত ব্যক্তির নাক এবং গলার মিউকাস মেমব্রেনে বাস করে এবং মূলত কাশি, হাঁচি, এমনকি অন্যদের কাছাকাছি শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে স্কুল বা খেলার মাঠের মতো জনাকীর্ণ জায়গায় এই ভাইরাস খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক থাকাটা স্বাভাবিক। তাই স্কুলগামী শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় অনেক পরিবার এরই মধ্যে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করছে।
এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের সুরক্ষায় এগিয়ে এসেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের একাধিক স্কুল কর্তৃপক্ষ অভিভাবকদের উদ্দেশে লিখিত নোটিশ জারি করেছে। জ্বর, ফুসকুড়ি বা সংক্রামক রোগের উপসর্গ দেখা দিলে শিক্ষার্থীদের সম্পূর্ণ সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত স্কুলে না পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান মৌখিকভাবেও একই নির্দেশনা দিচ্ছে।
এদিকে সন্দেহজনক হাম বা এ রোগের উপসর্গ নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় আরও ১০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে অতিসংক্রামক হামে প্রাণ হারিয়েছে আরও এক শিশু। আর এসব মৃত্যুর বেশির ভাগই ঢাকা বিভাগে। এ সময়ে সন্দেহজনক হাম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৬৪১ শিশু। হাম শনাক্ত হয়েছে ২২৪ শিশুর দেহে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।
এ বিষয়ে কথা হয় বিভিন্ন স্কুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে। তারা জানায়, একাধিক শিক্ষার্থী একই শ্রেণিকক্ষে দীর্ঘ সময় একসঙ্গে অবস্থান করায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। তাই শুরু থেকেই সতর্কতা অবলম্বন করাই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উপস্থিতি নীতিতেও সাময়িক নমনীয়তা দেখানোর ইঙ্গিত দিয়েছে, যাতে অসুস্থতার কারণে কোনো শিক্ষার্থী শিক্ষাগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
ইতোমধ্যে ঝুঁকি মোকাবেলায় বাংলাদেশ ইন্টারন্যাাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ কর্তৃপক্ষ এক লিখিত নির্দেশনা দিয়েছে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় হাম রোগের প্রাদুর্ভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। এমতাবস্থায় যদি কোনো শিক্ষার্থীর মধ্যে হামের উপসর্গ (যেমন জ্বর, শরীরে ফুসকুড়ি, সর্দি-কাশি ইত্যাদি) দেখা যায়, তাহলে তাকে স্কুলে না পাঠিয়ে বাসায় বিশ্রামে রাখার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে। রাজধানীর আরও কয়েকটি স্কুল থেকেও অভিভাবকদের প্রায় একই ধরনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
অভিভাবকরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে যেসব জেলায় হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে সেগুলোয় সাময়িক সময়ের জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ রাখা এবং বিদ্যালয়গুলোয়ই শিক্ষার্থীদের টিকাদানের উদ্যোগ নেয়া উচিত। বরগুনার বাসিন্দা মো. হাবিবুর রহমান বলেন, বরগুনায় হাম পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এমন পরিস্থিতিতে সন্তানকে বিদ্যালয়ে পাঠানো খুবই ঝুঁকিপূর্ণ মনে হওয়ায় গত দুইদিন পাঠাইনি। কারণ গ্রামাঞ্চলে সব অভিভাবক সচেতন নন এবং আমার মনে হয়, এমন অনেক শিশুই আছে যাদের টিকা দেয়া হয়নি। সরকারেরও বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত এবং হাম যেসব এলাকায় বেশি ছড়াচ্ছে সেসব এলাকায় অন্তত এক সপ্তাহের জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ রাখা যেতে পারে।
দ.ক.সিআর.২৬