সৈয়দ মোশাররফ আলী (আনাছ) : একদা আমাদের বাড়িতে এক গৃহহীন লোক তাঁর পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন। তাঁর নাম ছিল ইছাদ উল্লা। তিনি আমাদের জমিতে চাষ করতেন এবং বাড়ির অন্যান্য কাজেও সাহায্য করতেন। ভদ্রলোক কিন্তু একজন অসাধারণ গল্পকথক ছিলেন। তাঁর গল্প শুনলে আমরা মুগ্ধ হয়ে যেতাম। আমি প্রায়ই গল্প শোনার লোভে তাঁর পাশে গিয়ে বসতাম। গল্প শোনার জন্য মাঝেমধ্যে তাঁকে চা খাওয়াতাম কিংবা সামান্য আর্থিক সাহায্য করতাম। তেমনি একদিন, এক পরন্ত বিকেলে, তাঁর বলা একটি গল্প আপনাদের শোনাচ্ছি—
ইছাদ উল্লা: বুঝেছ ভাতিজা, বাঙালিরা ব্রিটিশদের থেকেও বেশি বুদ্ধিমান।
আমি: কীভাবে চাচা?
ইছাদ উল্লা: তবে শোন। ব্রিটিশ আমলে তৎকালীন শাসকরা গোগাউড়া গ্রামে একটি বিমানবন্দর নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিল। তারা যে জায়গাটি নির্বাচন করল, সেটি ছিল একটি বিশাল কলাগাছের বাগান। সেই কলাগাছ কাটার জন্য তারা স্থানীয় লোকদের শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ দিল। শ্রমিকরা যাতে বেশি দিন কাজ করে বেশি মজুরি নিতে পারে, সেই আশায় দা'য়ের উল্টো পাশ দিয়ে কলাগাছের গোড়ায় কোপ দিতে লাগল। এতে করে গাছ কাটত না। সারাদিন ধরে এভাবে কোপাকুপি করেও একটি গাছই কাটত একজন শ্রমিক। ফলে কাজ শেষ হতে অনেক সময় লাগছিল। এই সমস্যার সমাধানে এক ব্রিটিশ প্রশাসক মাঠে এলেন। তিনি এসে দেখলেন, শ্রমিকদের কাজে কোনো শিথিলতা নেই। বরং তারা প্রাণপণে চেষ্টা করে যাচ্ছে। দৃশ্যটি দেখে তিনি কাজের মজুরি দ্বিগুণ করে দিলেন। আশ্চর্যজনকভাবে, পরদিনই শ্রমিকরা গোটা কলাবাগান কেটে ফেলল। ব্রিটিশ প্রশাসকরা হতবাক হয়ে গেল!
এখন বুঝলা ভাতিজা, বাঙালিরা কীভাবে ব্রিটিশদের চেয়েও বেশি বুদ্ধিমান?
শৈশবে আমি ঠিকই ইছাদ উল্লার গল্প শুনে বিশ্বাস করেছিলাম যে বাঙালিরা ব্রিটিশদের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান। কিন্তু এখন মনে প্রশ্ন জাগে—জায়গা আমার, কলাগাছও আমার। আমার চোখের সামনেই আমার জায়গা দখল করে আমাকে খুব সামান্য মজুরি দিয়ে আমারই শ্রমে কলাগাছ কাটিয়ে জায়গা পরিষ্কার করে ব্রিটিশরা তাদের প্রয়োজনে বিমানবন্দর বানাবে। আর আমি দা'য়ের উল্টো পাশ দিয়ে কোপ মেরে একদিনের জায়গায় দুদিন কাজ করে সামান্য মজুরি বাড়িয়ে নিয়ে নিজেকে বুদ্ধিমান মনে করছি!
আমার চোখের সামনেই আমারই ট্রিলিয়ন টাকার সম্পদ এক বা দুই টাকার বিনিময়ে আমাকে দিয়েই লুটে নেওয়া হচ্ছে, অথচ আমি টেরই পাচ্ছি না! দুইশত বছরের মতো শাসন করে ব্রিটিশরা ভারতবর্ষ থেকে প্রায় ৪৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার (৪৫ লক্ষ কোটি টাকা) লুট করে নিয়ে গেছে, যা ব্রিটেনের বর্তমান জিডিপির প্রায় ১৭ গুণ। যদি সেই ৭৮ বছর আগে লুট করে নেওয়া টাকার বর্তমান টাইম ভ্যালু অব মানি হিসাব করতে চাই, তবে হয়তো সুপারকম্পিউটারও দরকার পড়বে!
এই সম্পদ কি ব্রিটিশরা ফেরত দিয়েছে? তারা কি আমাদের বীর স্বাধীনতাকামী তিতুমীর, ক্ষুদিরাম ও অগণিত শহীদদের হত্যার জন্য ক্ষমা চেয়েছে? অসংখ্য মানুষকে আহত করা এবং নির্যাতন করার জন্য ক্ষমা চেয়েছে? আমরা কি কখনো তাদের কাছে আমাদের লুট হওয়া সম্পদ ফেরত চেয়েছি? তাদের কৃত বর্বরতার জন্য কি কখনো ক্ষমা প্রার্থনার দাবি তুলেছি?
বরং আজ দেখি আমাদের কতিপয় শিক্ষিত (!) মানুষ বলছে, ব্রিটিশরা নাকি আমাদের শিক্ষিত করেছে, উন্নয়ন করেছে, সভ্য করেছে! আবার ব্রিটিশ পাসপোর্ট পাওয়ার স্বপ্ন তো অনেকেই মনে মনে পুষে রাখে—তাই না? এই হল আমাদের অবস্থা!
#বি.দ্র: ইছাদ উল্লার বলা গল্পটি সত্য না মিথ্যা, তা আমি জানি না। সত্যতা যাচাইয়েরও উপায় নেই, কারণ তিনি আর বেঁচে নেই। এবং ব্রিটিশদের লুট করা সম্পদের হিসাব ইন্টারনেট থেকে নেওয়া। সুতরাং লেখাটি নিছক একটি গল্প হিসেবেও নিতে পারেন, কিংবা সত্য বলেও ধরতে পারেন—আপনার ইচ্ছা। লেখাটির কোনো অংশের জন্য আমি দায়ী নই।
লেখক: সৈয়দ মোশাররফ আলী (আনাছ)
সহকারী শিক্ষক, ৩৬তম বিসিএস (নন ক্যাডার)
বসন্ত কুমারী গোপাল চন্দ্র সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, হবিগঞ্জ।
দ.ক.সিআর.২৬