আসাদ ঠাকুর, অমনিবাস: চুনারুঘাট শহরের পদক্ষেপ গণপাঠাগার কেবল বই পড়ার স্থান নয়। এই প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে নিয়মিত শিক্ষা উপকরণ বিতরণের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ, শব্দার্থ, রচনা, কবিতা, আবৃত্তি ও বই পড়ার প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মানসিক ও বৌদ্ধিক বিকাশ ঘটে।
পাঠাগারটির অবস্থান চুনারুঘাট উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্সের ডান দিকের অংশের একটি কক্ষ। আর এই একটি ছোট কক্ষ আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে পুরো অঞ্চলে। ছোট ছেলে-মেয়েরা জীবনে নতুন আশা নিয়ে আসে পাঠাগারে।
লাইব্রেরিতে পাঠাভ্যাস গড়তে পারলে নিজের কমিউনিকেশন দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস বাড়ে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিশ্লেষণ-ক্ষমতা প্রোথিত হয় আর সূক্ষ্ম চিন্তাভাবনা করতে পারবেন। পাঠ হজম করে, জাবর কেটে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা বাড়বে। লেখক বা সাংবাদিকতা জগতের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হতে পারে। শিক্ষার্থীদের কেউ যদি ইচ্ছা করে সে এ সেক্টরে নিজের ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে পারে। অথবা লেখালেখির জগতের প্রতি অনুরাগ তৈরি হতে পারে। অন্যান্য লেখক, গল্পকার, কবি ও সাহিত্যিক ও সমালোচকদের দেখে লেখক হওয়ার স্বপ্ন তৈরি হতে পারে। তরুণ প্রজন্ম লেখালেখিতে আগ্রহী হলে দেশ ও সমাজে বুদ্ধিজীবী, চিন্তক, লেখক ও সচেতন নাগরিকদের সংখ্যা বাড়বে। যা আলোকিত সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখে।
এছাড়া আনন্দ ও পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার পথে হাঁটা হয় বলে শিক্ষার্থীরা আনন্দ, উল্লাস, ও আগ্রহ নিয়ে নানা রকম অভিজ্ঞতা লাভ করে যা শ্রেণীকক্ষে পায় না। উপভোগ্য পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে শিক্ষা লাভের সুযোগ পায়। এরিস্টটল বলেছিলেন ''আমি কখনও মানুষকে পড়াই না, আমি কেবল আরামদায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করি, যেখান থেকে শিক্ষায় আগ্রহীরা সহজেই শিখে নেয়''। তাই শিক্ষাসফরে বা বইমেলায় গেলে সে রকম একটি আরামদায়ক ও আনন্দঘন পরিবেশে যাওয়া হয়। আর শিক্ষা ও জ্ঞান সহজেই লাভ করবে শিক্ষার্থীরা।
পাঠাগার সম্পৃক্ততার আরও সুফল হলো- বহির্বিশ্বের সাথে পরিচিত হওয়া যায়। বিদেশি ভাষা, কৃষ্টি, কালচার, সাহিত্য, ব্যবসা ও উদ্যোক্তাদের অনেক বই সংগ্রহ করতে পারবে। এসব বই দেখলে ও পড়লে বৈশ্বিক সাহিত্য, ইতিহাস ও ঐতিহ্য জানতে পারবে ও নিজেদের চিন্তার পরিপ্রেক্ষিতকে বৃহত্তর পরিসরে নিয়ে যেতে সক্ষম হবে। যা ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্ব গঠনে প্রচুর সহায়ক।
চুনারুঘাট পৌরসভার বাসিন্দা মোহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম। সহকারী অধ্যাপক, লংলা আধুনিক ডিগ্রী কলেজ। প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, পদক্ষেপ গণপাঠাগার। গল্পে গল্পে শোনান লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার কথা— ❝একটি লাইব্রেরি একটি সমাজ বদলাতে পারে❞—এই ধারণা থেকে বন্ধুদের সাথে প্রথম লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ব্যক্ত করেন। ওই সময় ৯০ ব্যাচের সহপাঠী বন্ধুরা সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেন। এবং পরবর্তিতে এসএসসি-৯০ ব্যাচের বন্ধুরা সম্মিলিতভাবে পদক্ষেপ গণপাঠাগার গড়ে তোলেন। তিনি বলেন, এখনও আমার আয়ের একটি অংশ পাঠাগারে খরচ করি। এ ছাড়া পাঠাগারের সদস্য ও দাদা বন্ধুদের কাছ থেকে অনুদান পাই আমরা।
পদক্ষেপ গণপাঠাগারের বর্তমান সভাপতি, বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মোস্তফা মোরশেদ। তিনি পাঠাগারের স্থায়ী ভবন নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের সঙ্গে আলোচনা করেন। পরবর্তিতে পৌরসভার বাগবাড়ি এলাকায় (উপজেলা খাদ্য গুদাম সংলগ্ন) আহসানুল করিম সেবক কর্তৃক প্রায় ৩ শতক জমি লাইব্রেরির ভবন নির্মাণের জন্য দান করেন। যার নির্মাণ কাজ শীঘ্রই শুরু হবে- "এডভোকেট শুকুর মোহাম্মদ (মাস্টার) ভবন"।
বর্তমানে লাইব্রেরিতে একজন বেতনভুক্ত খণ্ডকালীন সহকারী আছেন। লাইব্রেরিয়ান জাহিদুর রশিদ রোমান। তিনি জানান, লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত রয়েছে দেশি-বিদেশি অন্তত ৪ হাজার বই। যা শিক্ষার্থীদের জ্ঞানচর্চা ও অনুপ্রেরণার উৎস। শিক্ষার্থীরা এখানে বসে পাঠ্যবই, সাধারণ জ্ঞান, প্রবন্ধ ও সাহিত্য পাঠের মাধ্যমে নিজেদের দক্ষতা ও জ্ঞানসম্ভার বৃদ্ধি করছে। লাইব্রেরির উদ্যোগে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা—রচনা, শব্দার্থ ও বই পড়া পরিচালিত হয়। এতে শিক্ষার্থীদের কেবল পড়াশোনাতেই নয়, ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্ব গঠনে সক্ষম হচ্ছে।
শুধু শিক্ষাই নয়, লাইব্রেরিটি চুনারুঘাট শহরে সামাজিক সচেতনতা ও মানবিক মূল্যবোধও বৃদ্ধি করছে। স্থানীয় স্কুল, কলেজ শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বাড়ানো, ঝরে পড়া কমানো এবং তরুণদের জীবনে স্বপ্ন দেখার উদ্দীপনা তৈরির মতো অনেক বিষয় পাঠাগার সম্পৃক্ত কর্তা ব্যক্তিরা লাইব্রেরিতে বসে ভাবেন এবং পরিকল্পনা মাফিক কাজ করে আসছেন।
উল্লেখ যে, চুনারুঘাট পদক্ষেপ গণপাঠাগার বাংলাদেশ সরকারের বেসরকারি গ্রন্থাগারের মধ্যে "ক"শ্রেণিভুক্ত একটি পাঠাগার। যেখানে জাতীয় সকল দিবস কর্তব্য ও নিষ্টার সাথে পালন করা হয়ে থাকে। এখানে বছরে দুইবার বইপাঠ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়, যাতে স্থানীয় শিক্ষার্থীদের মাঝে পাঠাভ্যাস গড়ে ওঠে।
চুনারুঘাট উপজেলার আহম্মদাবাদের কৃতি সন্তান, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইফ সায়েন্স অনুষদের ডিন, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ার অধ্যাপক ড. মো: ফারুক মিয়া বলেন, তিনি পদক্ষেপ গণপাঠাগারে গিয়েছেন। চুনারুঘাটে এমন একটি উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়।
দ.ক.সিআর.২৬