বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন একজন ফার্স্ট লেডি, একজন রাজনীতিক, একজন জাতীয় নেতা- কিন্তু সর্বোপরি তিনি ছিলেন দুই সন্তানের জননী। একজন মা হিসেবে তাকে গভীর কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। ছেলে আরাফাত ‘কোকো’-এর মরণব্যাধির সময়ে তাকে পাশে থাকতে দেওয়া হয়নি। তিনি তাকে দেখতে পেয়েছিলেন কেবল মৃত্যুর পর। অন্য ছেলে তারেক রহমান দীর্ঘদিন লন্ডনে বাধ্যতামূলক নির্বাসনে ছিলেন, মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে। যে কোনো মুহূর্তে তিনি দেশ ছাড়তে পারতেন এই অসহনীয় যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে- কিন্তু তিনি থেকে গেছেন, নিজের আপসহীন আদর্শ ও বাংলাদেশের প্রতি অঙ্গীকার আঁকড়ে ধরে। কিছুই তাকে দেশ ও জাতির জন্য কাজ করা থেকে বিরত রাখতে পারেনি। তিনি শুধু একজন নারী নেতা ছিলেন না- তিনি নিশ্চিত করেছিলেন যে বাংলাদেশের নারীরাও নেতৃত্ব দিতে পারে।
তিনি মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করেন, সরকারি চাকরি ও শিক্ষায় নারীদের জন্য সংরক্ষিত কোটা চালু করেন এবং পুলিশ ও স্থানীয় সরকার কাঠামোতে নারীদের অন্তর্ভুক্ত করেন। এসব পদক্ষেপ নারীদের জাতীয় উন্নয়নের মূলধারায় নিয়ে আসে।
খালেদা জিয়ার যুগান্তকারী ‘ফিমেল সেকেন্ডারি স্কুল অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রাম(১৯৯৪)’ গ্রামীণ মেয়েদের জন্য মাধ্যমিক শিক্ষা বিনামূল্যে করে দেয়—ফলে ভর্তি বৃদ্ধি পায়, বাল্যবিবাহ কমে যায়, জন্মহার হ্রাস পায় এবং লক্ষ লক্ষ মেয়েদের জন্য নতুন অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হয়। তিনি প্রাথমিক শিক্ষাকে শক্তিশালী করেন। তিনি ১৯৯৫ সালে ‘বেগম রোকেয়া’ পদক প্রবর্তন করেন-যা বাংলাদেশের নারীদের জন্য অন্যতম সর্বোচ্চ সম্মাননা।
সংসদে নারীর সংরক্ষিত আসন ৩০ থেকে বাড়িয়ে ৫০ করেন, ফলে জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর প্রতিনিধিত্ব আরও বৃদ্ধি পায়। নাগরিক প্রশাসন, স্থানীয় সরকার ও জাতীয় রাজনীতিতে নারীর ভূমিকা অভূতপূর্ব মাত্রায় সম্প্রসারিত হয়।
তার সরকার ধর্ষণ, অ্যাসিড সন্ত্রাস ও যৌতুকের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন করে-যেখানে শাস্তি দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড থেকে শুরু করে গুরুতর ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত নির্ধারিত ছিল। নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়।
তিনি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করেন এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য নারী কোটা চালু করেন, ফলে মেয়েদের ভর্তি নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। তিনি ‘ন্যাশনাল ফোরাম ফর উইমেন’ এর মাধ্যমে নারীর অধিকারকে শক্তিশালী করেন এবং পুলিশ বাহিনীতে নারীর অন্তর্ভুক্তি পুনরায় চালু করেন-যা প্রথম শুরু করেছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান।
এছাড়াও তার নেতৃত্বে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি বজায় থাকে। তিনি রাজনীতিতে শিষ্টাচার বজায় রেখেছেন এবং ব্যক্তিগত আক্রমণ থেকে বিরত থেকেছেন। বৈচিত্র্যপূর্ণ বিভিন্ন দলকে একত্রিত করার ক্ষমতার জন্য তিনি কখনো কখনো ‘সব দলের নেতা’ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন।
খালেদা জিয়ার অবদান খাটো করার চেষ্টা সত্ত্বেও তাঁর সংস্কার আজও বেঁচে আছে- মেয়ে ভরা শ্রেণিকক্ষে, নারী নেতৃত্বাধীন কর্মক্ষেত্রে, স্থানীয় সরকারে, পুলিশ বাহিনীতে, সংসদে এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে-যেখানে বাংলাদেশের নারীরা আজ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মাথা উঁচু করে দাঁড়াচ্ছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, কিন্তু সেটিকে জনগণের হৃদয়ে পৌঁছে দিয়েছিলেন বেগম খালেদা জিয়া।
একজন গৃহিণী থেকে দেশের নির্বাচিত নেতা হয়ে ওঠা বেগম খালেদা জিয়া কেবল একটি নাম নয়. তার রাজনৈতিক জীবন বাংলাদেশের আধুনিক ইতিহাসের এক সংজ্ঞায়িত অধ্যায়।
দ.ক.সিআর.২৫