পারভেজ হাসান লাখাই : লাখাই উপজেলার ১ নং লাখাই ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ৮ মাস আয়ার কাজ করেও বেতন পাননি লাখাই আমানউল্লাহপুরের জহুরা খাতুন (৫০)। স্বামী মৃত মতি মিয়ার মৃত্যুর পর চার সন্তানের জননী দুই প্রতিবন্ধী ছেলে ও দুই মেয়ে এই নারী পেটের দায়ে চাকরি নিতে বাধ্য হয়েছিলেন, কিন্তু সেখানেও শিকার হলেন চরম বঞ্চনার। কাজ ছাড়ার দেড় বছর পার হলেও এখনও তিনি তার ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত।
জহুরা খাতুন জানান, তিনি ২০২৩ সালের ১ লা মার্চ থেকে প্রায় আট মাস ১ নং লাখাই উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে আয়া হিসেবে কাজ করেন। কিন্তু বারবার অনুরোধের পরেও যখন তিনি বেতন পাননি, তখন বাধ্য হয়ে চাকরি ছেড়ে দেন। এরপর বেতনের জন্য বিভিন্ন জায়গায় ধরনা দিয়েও কোনো লাভ হয়নি।
তিনি আরও বলেন, "আমি রিতা ম্যাডামের সাথে কাজ করেছি। বেতনের জন্য চেয়ারম্যানের কাছে গেলে তিনি আমাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার কাছে পাঠান। অসহায় মানুষ, কোনো পথ না পেয়ে অবশেষে চাকরি ছেড়ে দেই।" বর্তমানে জীবিকার তাগিদে তিনি বাড়ির পাশে একটি ছোট টং দোকান দিয়ে চা ও বাচ্চাদের খাবার বিক্রি করেন। দৈনিক তিন থেকে চারশো টাকা বিক্রি হলেও, এই সামান্য আয় দিয়ে চলছে তাঁর মানবেতর জীবন।
এই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা একে অপরের উপর দায় চাপাচ্ছেন।
রিতা আক্তার (MIDWIFE) জানান, উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে কাজের সহযোগিতার জন্য তিনি তৎকালীন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আবু হেনা মোস্তফার কাছে একজন আয়া চেয়েছিলেন। বাজেটের অভাব জানালে তিনি হেলথ অ্যাসিস্ট্যান্ট নজরুল ইসলামকে সাথে নিয়ে চেয়ারম্যান আরিফ আহমেদ রূপনের সাথে কথা বলে। চেয়ারম্যানের সম্মতিক্রমে জহুরা খাতুনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। রিতা আক্তার জানান, তিনি নিজের খাবার থেকে জহুরাকে খাওয়াতেন। দুই মাস পর চেয়ারম্যানকে বেতনের কথা বললে তিনি আরও দুই মাস পরে দেওয়ার আশ্বাস দেন। এভাবে আট মাস কেটে যায়, কিন্তু জহুরা খাতুন বেতন পাননি।
তিনি আরও বলেন, এই চাকরির বেতন চেয়ারম্যানের বাজেট থেকে দেওয়ার কথা ছিল এবং চেয়ারম্যান নিজেও জহুরাকে বেতন দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন।
চেয়ারম্যান আরিফ আহমেদ রূপন বলেন, তিনি বেতন দেওয়ার জন্য একাধিকবার উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে অনুরোধ করেছেন। উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ফান্ড থেকেও বেতন দিতে বলেছিলেন। কিন্তু কেন বেতন দেওয়া হয়নি, তা তিনি জানেন না।বর্তমানে কর্মরত উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা কাজী শামসুল আরেফিন জানান, ওই আয়ার লিখিতভাবে কোনো যোগদানের তথ্য নেই। লিখিতভাবে যোগদান করানো হলে বিষয়টি তারা দেখতেন, কিন্তু এই অবস্থায় তিনি কিছু বলতে পারবেন না।
জহুরা খাতুনের বেতনের বিষয়টি এখন এক অদৃশ্য চক্রের ফাঁদে আটকে গেছে। একদিকে চেয়ারম্যান দায় চাপাচ্ছেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তার ওপর, অন্যদিকে স্বাস্থ্য কর্মকর্তা লিখিত ডকুমেন্ট না থাকার অজুহাত দেখাচ্ছেন। প্রশ্ন হলো— শুধুমাত্র মৌখিক নিয়োগের বলি হয়ে কি আট মাসের পরিশ্রমের ফল থেকে বঞ্চিত হবেন অসহায় জহুরা খাতুন? সত্যিই কি তাঁর বেতন দেওয়ার মতো কোনো ফান্ড নেই?
অসহায় জহুরা খাতুনের আকুল দাবি, তিনি যেন তাঁর প্রাপ্য আট মাসের বেতন দ্রুত পান।
এই বঞ্চনার শেষ কোথায়, আর কার উপর দায়িত্ব বর্তাবে এই মানবিক সমাধানের, সেটাই এখন লাখাইবাসীর প্রশ্ন।
দ.ক.সিআর.২৫